১৯৯০ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নার্স সরলা ভট্টকে অপহরণ, গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড়সড় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো। ঘটনার দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট’ (JKLF)-এর শীর্ষ নেতা ইয়াসিন মালিক এবং আরও চারজনের বিরুদ্ধে সোমবার আদালতে চার্জশিট জমা দিল জম্মু-কাশ্মীরের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি’ (SIA)। শ্রীনগরের বিশেষ আদালতে পেশ করা এই চার্জশিটটি মোট ৭৩৭ পাতার।
‘পরিকল্পিত অপরাধ’: চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর তথ্য
শ্রীনগরের বিশেষ আদালতে পেশ করা চার্জশিটে স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (SIA) তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সরলা ভট্টের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন জঙ্গি কার্যকলাপ ছিল না। বরং এর পেছনে ছিল এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। চার্জশিট অনুযায়ী:
“কাশ্মীর উপত্যকায় বসবাসকারী হিন্দু পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে তাঁদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনামাফিক এই নৃশংস অপরাধ ঘটানো হয়েছিল।”
উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে পাকিস্তানি মদতপুষ্ট জঙ্গি এবং দুষ্কৃতীদের লাগাতার হিংসা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লক্ষাধিক কাশ্মীরি পণ্ডিত উপত্যকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময় বেছে বেছে হিন্দু পণ্ডিতদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার অন্যতম শিকার ছিলেন শ্রীনগরের ‘শের-ই-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস’-এর ল্যাব টেকনিশিয়ান তথা নার্স সরলা ভট্ট।
অপহরণ ও নৃশংস নির্যাতনের বিবরণ
চার্জশিটে ঘটনার রাতের শিউরে ওঠা বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের ১২ এপ্রিল রাতে হাসপাতাল থেকে ডিউটি শেষ করে ক্যাম্পাসের ভেতরেই অবস্থিত নিজের হোস্টেলে ফিরছিলেন সরলা ভট্ট। সেই সময় এই হত্যাকাণ্ডের মূল চক্রান্তকারী ইয়াসিন মালিকের নির্দেশে তার সঙ্গীরা একটি গাড়িতে করে সরলাকে মাঝরাস্তায় অপহরণ করে।
এরপর একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন ও গণধর্ষণ চালানো হয়। পাশবিক নির্যাতনের পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর, শ্রীনগরের একটি জনবহুল সড়ক থেকে তাঁর বুলেটবিদ্ধ এবং ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
৩৫ বছর পর পুনর্তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার পর শ্রীনগরের ‘টাডা’ (TADA) আদালতে একটি এফআইআর রুজু করা হলেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে সেই তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অবশেষে গত বছরের (২০২৫) আগস্ট মাসে এই মামলার নতুন করে তদন্ত শুরু করার কথা ঘোষণা করে এসআইএ (SIA)। তার পরেই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে এই চার্জশিট জমা দেওয়া হলো।
অভিযুক্ত ইয়াসিন মালিকের প্রোফাইল:
- বর্তমান অবস্থান: ২০২২ সালের ২৪ মে সন্ত্রাসে আর্থিক মদত (Terror Funding) এবং দেশদ্রোহী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অপরাধে দিল্লির নিম্ন আদালত ইয়াসিন মালিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। বর্তমানে সে দিল্লির তিহাড় জেলে সাজা কাটছে।
- অন্যান্য অপরাধের খতিয়ান: সরলা ভট্ট মামলা ছাড়াও, ১৯৮৯ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সঈদের কন্যা রুবাইয়া সঈদ অপহরণ এবং ১৯৯০ সালে শ্রীনগরের উপকণ্ঠে ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) চার জওয়ানকে নৃশংসভাবে খুনের মামলাতেও ইয়াসিন মালিক অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত।

