“তৃণমূলে একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট”— ছয় বছর আগে ঘাসফুল শিবির ত্যাগ করার সময় এই বিস্ফোরক অভিযোগ করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দক্ষিণ কলকাতার নেতাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে তিনি সরব হয়েছিলেন জেলা ও মফস্বলের নেতৃত্বের অধিকার নিয়ে। শুক্রবার সেই লড়াই এক পূর্ণতা পেল। রাজ্যে প্রথমবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমবঙ্গের নয়া মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষিত হল ‘মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র’ শুভেন্দু অধিকারীর নাম। এই খবর পৌঁছনো মাত্রই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতেছে গোটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা।
অজয় মুখোপাধ্যায়ের পর শুভেন্দু: জেলার মুকুটে নয়া পালক
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা এর আগে অজয় মুখোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছিল, যিনি বাংলা কংগ্রেস ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর ফের এই জেলার সন্তান রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হচ্ছেন। শুক্রবার অমিত শাহর ঘোষণার পর থেকেই কাঁথিতে অধিকারী পরিবারের বাসভবন ‘শান্তিকুঞ্জ’-এর সামনে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। তাসাপার্টি, লাউডস্পিকার আর গেরুয়া আবিরে ঢেকে গিয়েছে গোটা শহর।
গর্বিত পিতা শিশির অধিকারী: ‘বুড়ি’ থেকে ‘মুখ্যমন্ত্রী’
ছেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্য চাক্ষুষ করতে অশক্ত শরীর নিয়েই কলকাতা পৌঁছে গিয়েছেন শান্তিকুঞ্জের কর্তা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিশির অধিকারী। কাঁথিবাসী যাঁকে ‘বুবাইদা’ বলে চেনেন, পরিবারের অন্দরে তাঁর নাম ‘বুড়ি’। পুত্র আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী— এই অনুভূতিতে আবেগপ্রবণ প্রবীণ রাজনীতিক। রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক গর্বিত পিতা হিসেবে তিনি শনিবার ব্রিগেডের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
নন্দীগ্রামের উচ্ছ্বাস: প্রহর গুনছে ‘কর্মভূমি’
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্তরণের অন্যতম ভিত্তিভূমি নন্দীগ্রামও এখন উৎসবের আলোয় উজ্জ্বল। রেয়াপাড়া, হরিপুর থেকে শুরু করে নন্দীগ্রাম বাজার— রাতভর চলেছে গানবাজনা। স্থানীয় বিজেপি নেতা ধনঞ্জয় ঘোড়া বলেন,
“দাদা দেখিয়ে দিয়েছেন লড়াই কাকে বলে। মেদিনীপুরের ছেলে পশ্চিমবঙ্গকে পথ দেখাবে, এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে? আমরা নিশ্চিত, বিজেপির ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন।”
অন্য এক নেতা বটকৃষ্ণ দাস জানান, আগে শুভেন্দু কেবল নন্দীগ্রামের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এবার তাঁর কাঁধে গোটা রাজ্যের গুরুদায়িত্ব। শনিবার নন্দীগ্রাম ও গোটা পূর্ব মেদিনীপুর থেকে কয়েক হাজার মানুষ কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।
মানুষের প্রত্যাশা
নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের প্রিয় ‘দাদা’র মুখ্যমন্ত্রী হওয়াই সবথেকে বড় পাওনা। এলাকার এক প্রবীণ নাগরিকের কথায়, “নন্দীগ্রামবাসীর সব চাহিদা উনি পূরণ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও উনি নন্দীগ্রামকে কখনো উপেক্ষা করবেন না।”
শনিবার সকালে ব্রিগেডের মেগা মঞ্চে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী। একদিকে যখন কলকাতা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে, অন্যদিকে তখন মেদিনীপুরের ঘরে ঘরে চলছে জয়ের আনন্দ উৎসব। দক্ষিণ কলকাতার আধিপত্য ভেঙে জেলার নেতার এই অভিষেককে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মোড় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

