গ্রীষ্মের ছুটির মরসুমে দেশের ভ্রমণপিপাসু ও সাধারণ বিমানযাত্রীদের জন্য চরম দুঃসংবাদ। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে (Indian Aviation Sector) দেখা দিয়েছে এক অভূতপূর্ব ও মারাত্মক সংকট। দেশের প্রথম সারির তিন বৃহৎ বিমান সংস্থা— ইন্ডিগো (IndiGo), এয়ার ইন্ডিয়া (Air India) এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস (Air India Express) একযোগে তাদের অভ্যন্তরীণ উড়ানের (Domestic Flights) সংখ্যা বিপুল পরিমাণে হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, বিমান ছাঁটাইয়ের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের জেরে দেশের ব্যস্ততম চার রুট— বিশেষত মুম্বই, দিল্লি এবং বেঙ্গালুরু সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে।
চাহিদার তুলনায় বিমানের সংখ্যা একধাক্কায় কমে যাওয়ায় টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে বিমান বাতিলের আশঙ্কায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বিমান সংকট সৃষ্টির নেপথ্যে প্রধান তিন কারণ
হঠাৎ কেন দেশের আকাশপথে এমন অচলাবস্থা তৈরি হলো, তা নিয়ে অ্যারোস্পেস বিশ্লেষক ও বিমান সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান কারণ দর্শানো হয়েছে:
১. ইঞ্জিন বিভ্রাট ও ‘গ্রাউন্ডেড’ বিমান: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি’ (P&W)-এর ইঞ্জিনে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা গেছে। এর ফলে ইন্ডিগো এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের বহু বিমান বর্তমানে ওড়ার অযোগ্য হয়ে রানওয়েতেই দাঁড়িয়ে (Grounded) আছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন ইঞ্জিন বা খুচরো যন্ত্রাংশ সময়মতো না পাওয়ায় এই জটিলতা আরও বেড়েছে। ২. পাইলট ও ক্রু মেম্বারদের তীব্র ঘাটতি: এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের ম্যানেজমেন্ট বা কর্তৃপক্ষের সাথে ক্রু মেম্বারদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং ইন্ডিগোর পাইলটদের অতিরিক্ত ডিউটিজনিত ক্লান্তির কারণে বিমান চালনাকারী কর্মীবাহিনীর অভাব দেখা দিয়েছে। ৩. এয়ারপোর্ট স্লটের সীমাবদ্ধতা: মুম্বই ও দিল্লির মতো দেশের অত্যন্ত ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলিতে রানওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় এবং অতিরিক্ত এয়ার ট্রাফিকের কারণে বিমান সংস্থাগুলো দৈনিক উড়ানের সংখ্যা কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রো রুটগুলি
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক মেট্রো রুটগুলিকেই এই বিমান ছাঁটাইয়ের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে:
- মুম্বই-দিল্লি রুট: এটি ভারতের ব্যস্ততম আকাশপথ। এই রুটে ইন্ডিগো এবং এয়ার ইন্ডিয়া তাদের দৈনিক উড়ানের সংখ্যা প্রায় ১৫% থেকে ২০% পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।
- বেঙ্গালুরু ও অন্যান্য রুট: বেঙ্গালুরুর সঙ্গে দিল্লি ও মুম্বইয়ের সংযোগকারী একাধিক ‘নন-স্টপ’ উড়ান বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কলকাতা, হায়দরাবাদ ও চেন্নাইগামী বেশ কিছু বিমানও এই ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়েছে। জরুরি ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাঁরা এখন বিকল্প ফ্লাইটের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।
টিকিটের দাম বৃদ্ধি ও যাত্রীদের ক্ষোভ
চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বিগড়ে যাওয়ায় অবশিষ্ট বিমানগুলির টিকিটের দাম হু হু করে বাড়ছে। যাত্রার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে টিকিট কাটার খরচ (Spot Fair) প্রায় ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে বিমান বাতিলের খবর যাত্রার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জানানো হচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলো টিকিটের টাকা ফেরত (Refund) বা বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলেও, শেষ মুহূর্তে অন্য বিমানের টিকিটের দাম এতটাই বেশি থাকছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিজিসিএ-র কড়া নজরদারি
অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবার এই বেগতিক পরিস্থিতি দেখে দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়ামক সংস্থা ‘ডিজিসিএ’ (DGCA) এবং কেন্দ্রীয় বিমান মন্ত্রক গোটা বিষয়টির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে। বিমান সংস্থাগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন অগ্রিম বুকিং করা যাত্রীদের কোনোভাবে হয়রানি না করে এবং বিমান বাতিলের তথ্য যথাসম্ভব আগে সরবরাহ করে।
বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে লিজ নেওয়া (Leased) নতুন বিমান ভারতের বিমানবহরে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং ইঞ্জিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আগামী কয়েক মাস এই সংকট বজায় থাকবে। তাই যাত্রীদের বিমান যাত্রার পরিকল্পনা করার আগে ভালো করে শিডিউল ও লাইভ স্টেটাস (Live Status) চেক করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

