রাজ্য সরকারের স্বপ্নের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্প নিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলায় এক ব্যাপক আর্থিক জালিয়াতির চক্রের হদিস মিলল। বহরমপুরের পর এবার জেলারই রঘুনাথগঞ্জে এই জালিয়াতির জাল উন্মোচিত হয়েছে। অভিযোগ, এই প্রকল্পের টাকা বেআইনিভাবে পাচ্ছিলেন তারিকুর রহমান নামে স্থানীয় এক পুরুষ বাসিন্দা। তদন্তে জানা গেছে, একটি নয়, বরং তারিকুরের অন্তত আটটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নিয়ম করে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা ঢুকছিল। এই অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। এই নিয়ে এই জালিয়াতি চক্রে যুক্ত থাকার অপরাধে এখনও পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হলো।
নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি ও ‘সিট’ গঠন
দিন তিনেক আগে নবান্নে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে দেদার বেনোজল ও জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী রাকিবুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির নাম, ঠিকানা ও পারিবারিক সমস্ত তথ্য সংবাদমাধ্যমের সামনে পেশ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তার পরেই পুলিশ তৎপর হয়ে রাকিবুলকে গ্রেফতার করে।
এই জালিয়াতির শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ‘বিশেষ তদন্তকারী দল’ বা সিট (SIT) গঠন করে জোরকদমে তদন্ত শুরু হয়। ধৃত রাকিবুলকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার পর উঠে আসে মোস্তাফিজুর রহমান নামে আরও এক ব্যক্তির নাম। তদন্তকারীরা মোস্তাফিজুরকেও গ্রেফতার করেন।
আটটি অ্যাকাউন্টে ঢুকছিল সরকারি অর্থ
পুলিশি জেরায় তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ধৃত মোস্তাফিজুরের নামেও একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে এবং তিনিই মূলত এই জালিয়াতি চক্রের মূল মাথা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’। মোস্তাফিজুরকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদের পর রঘুনাথগঞ্জের বাসিন্দা তারিকুর রহমানের নাম সামনে আসে।
তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ভুয়ো নথি ব্যবহার করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিল। তারিকুরের নিজের নামে ৩টি, তাঁর স্ত্রীর নামে ৩টি এবং দুই ছেলের নামে ২টি— অর্থাৎ মোট ৮টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চালু ছিল। প্রতি মাসে নিয়ম করে এই অ্যাকাউন্টগুলিতে সরকারি প্রকল্পের মোট ৮,০০০ টাকা জমা হতো।
প্রশাসনের কড়া মনোভাব: তদন্তকারীদের অনুমান, কেবল তারিকুর বা রাকিবুলই নন, রাজ্যের এমন অনেক পুরুষ আছেন যাঁরা জালিয়াতি করে এতদিন ধরে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের টাকা বেআইনিভাবে তুলে আসছিলেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই ধরনের দুর্নীতি রুখতে প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে। রাজ্যজুড়ে তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে এবং এই চক্রে জড়িত কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
ডোমকলে তৃণমূল নেত্রীর স্বামী আটক
অন্যদিকে, ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মুর্শিদাবাদের ডোমকল পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূল সভাপতি সাহানা বিশ্বাসের স্বামীকে আটক করেছে ডোমকল থানার পুলিশ। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডোমকল এলাকায় এই প্রকল্প নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই বেনিয়মের অভিযোগ উঠছিল। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে শনিবার মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় চিরুনি তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে তাঁকে পাকড়াও করা হয়। এই চক্রের সঙ্গে আর কারা যুক্ত, তা জানতে ধৃত ও আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছেন ‘সিট’-এর আধিকারিকেরা।

