বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর, এই প্রথমবার কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে এক নজিরবিহীন ও মারাত্মক আক্রমণের শিকার হলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে মৃত এক দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের ওপর ইট, পাটকেল, ডিম এবং জুতো নিয়ে চড়াও হয় একদল বিক্ষোভকারী। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে হামলা থেকে রক্ষা করতে দলীয় কর্মীরা তাঁর মাথায় হেলমেট পরিয়ে দিলেও, এলোপাথাড়ি চড়-ঘুষির চোটে তা মাথা থেকে খুলে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় শেষমেশ গভীর রাতে তাঁকে কলকাতার মিন্টো পার্কের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
ভোটের ফলপ্রকাশের ২৫ দিন পর, শনিবার সোনারপুরের নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকার এবং উত্তর কলকাতার বেলেঘাটায় নিহত বিশ্বজিৎ পট্টনায়েকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কর্মসূচি ছিল অভিষেকের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজ্যের শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী তৃণমূলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
হরিশ মুখার্জি রোডে সিআইডি অভিযান ও নোটিস
শনিবার দুপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বেলেঘাটার নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সুকিয়া স্ট্রিটে কুণাল ঘোষের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই ভবানীপুরের হরিশ মুখার্জি রোডে তাঁর ‘শান্তনিকেতন’ বাসভবনে হানা দেয় রাজ্য সিআইডি (CID)-র একটি দল। বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের চিঠিতে স্বাক্ষর সংক্রান্ত একটি বিতর্কের তদন্তের স্বার্থে এই অভিযান চালানো হয় বলে জানা গেছে।
অভিষেক বাড়িতে না থাকায় সিআইডি আধিকারিকেরা সেখান থেকে ফিরে কালীঘাটে যান এবং তাঁর হাতে একটি নোটিস তুলে দেন। এই প্রসঙ্গে সিআইডি-র সমালোচনা করে অভিষেক জানান, তিনি দীর্ঘ সাত বছর ওই বাড়িতে থাকেন না— যা পুলিশের অজানা নয়। আইনি পথেই এর মোকাবিলা করার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “ভুয়ো মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে যারা আমার মাথা নত করতে চাইছে, তারা ভুল ভাবছে।” এরপরই তিনি সোনারপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
সোনারপুরে অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও শারীরিক নিগ্রহ
সোনারপুরে অভিষেক পৌঁছানোর আগেই এলাকা জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। হাতে কালো পতাকা ও কাঁচা-পচা ডিম নিয়ে জমায়েত করেন বিক্ষোভকারীরা। অভিষেকের কনভয় পৌঁছাতেই ‘গো ব্যাক’ এবং ‘চোর-চোর’ স্লোগান উঠতে শুরু করে।
সংকীর্ণ রাস্তার কারণে এসইউভি (SUV) গাড়ি ছেড়ে অভিষেক যখন সহকর্মীদের সঙ্গে তিনটি মোটরবাইকে করে নিহতের বাড়ির দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন বিক্ষোভকারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ডিম ও ইটের টুকরো ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে মোটরবাইক থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলে একদল জনতা তাঁকে ঘিরে ধরে সরাসরি শারীরিক নিগ্রহ ও চড়-ঘুষি মারতে শুরু করে। মাথা বাঁচাতে দলীয় কর্মীদের দেওয়া একটি ক্রিকেট হেলমেট পরলেও মারের আঘাতে সেটি খুলে যায় এবং তাঁর চশমা ভেঙে যায়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, মৃত সঞ্জু কর্মকার রাজনৈতিক হিংসার শিকার নন, বরং তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ ছিল।
“আমাকে খুনের চক্রান্ত হয়েছিল”, তোপ অভিষেকের
তীব্র নিগ্রহের পর জামায় ডিমের দাগ ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়েই নিহত কর্মীর বাড়ি পৌঁছান অভিষেক। সেখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ করেন:
- নিরাপত্তাহীনতা: প্রশাসন ও আইসি-কে আগাম জানানো সত্ত্বেও ঘটনাস্থলে কোনও পুলিশ উপস্থিত ছিল না। ফোন বা মেসেজের কোনও উত্তর মেলেনি।
- বহিরাগতদের হামলা: সোনারপুরের সাধারণ মানুষ এই হামলা করেননি। স্থানীয় একটি ব্যাঙ্কোয়েট হল ভাড়া করে বিজেপি বাইরে থেকে গুন্ডা এনে এই চক্রান্ত সংগঠিত করেছিল।
- আইনি পদক্ষেপ: চোখে একাধিকবার অস্ত্রোপচার হওয়া সত্ত্বেও যেভাবে তাঁর মুখে ও চোখে আঘাত করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে তিনি হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন।
হাসপাতাল বদল ও মমতার উদ্বেগ
সোনারপুর থেকে ফেরার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথমে ইএম বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে দেখতে যান তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। পরে মমতা অভিযোগ করেন, ওই হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা না হওয়ায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেওয়ার কারণে অভিষেককে মিন্টো পার্কের অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। শোভন চট্টোপাধ্যায় জানান, অভিষেকের মাথায় ও শরীরে চোট রয়েছে এবং তাঁর গা বমি ভাব রয়েছে। গভীর রাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অভিষেককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হামলার নিন্দায় সরব বিজেপি-বিরোধী দলগুলি
এই নজিরবিহীন হামলার তীব্র নিন্দা করেছে জাতীয় স্তরের একাধিক বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দল।
- কংগ্রেস: কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে বলেন, “বিরোধী দলের একজন জনপ্রিয় নেতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি।” প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অবশ্য একে একে অপরকে রক্ষা করার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
- সমাজবাদী পার্টি: অখিলেশ যাদব এই ঘটনাকে ‘প্রাণঘাতী হামলা’ আখ্যা দিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় ষড়যন্ত্রের প্রশ্ন তুলেছেন। আপ (AAP) প্রধান অরবিন্দ কেজরীবালও এই ঘটনার নিন্দা করেছেন।
পাল্টা দাবি শাসক বিজেপি ও সিপিএমের
আক্রমণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই, এটি মূলত স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের ফল। তিনি বলেন, “তৃণমূল আমাদের কর্মীদের ওপর যে অত্যাচার করেছে, আমরা সংযত ছিলাম বলেই আজ তৃণমূল অক্ষত আছে।” পাশাপাশি পুলিশ কেন ছিল না, সেই দায় তিনি রাজ্য সরকারের ওপরই চাপিয়েছেন।
অন্যদিকে, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বিষয়টিকে খোঁচা দিয়ে বলেন, “শত শত পুলিশের প্রহরায় ‘কোন বাপ আছে দেখে নেব’ বলে হুঙ্কার দেওয়া যেমন গণতন্ত্রে অনুচিত, তেমনই আজকের এই হামলাও কাম্য নয়।” তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, কোনো কৌশলে তৃণমূলকে প্রচারের আলোয় রাখতেই বিজেপি-আরএসএস এই ধরণের পথ বেছে নিয়েছে কি না, তা দেখার।

