পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন বাড়ছিল। রাজ্যের নতুন শাসক দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বইমেলার রাশ নিজেদের হাতে নেবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনার অবসান ঘটালেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সোমবার প্রকাশক ও লেখকদের নিয়ে গঠিত নতুন সংগঠন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’ (বিজিপি)-এর মঞ্চ থেকে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, কলকাতা বইমেলায় এতকাল ধরে চলে আসা ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-এর একাধিপত্যের দিন এবার ফুরোতে চলেছে। তবে গিল্ডকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হবে— এমন কোনো মন্তব্য তিনি করেননি।
মহাজাতি সদনের সভায় চমক: গিল্ড কর্তাদের উপস্থিতি
প্রয়াত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার কলকাতার মহাজাতি সদনে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করেছিল লেখক-প্রকাশকদের নতুন সংগঠন বিজিপি। সেখানে প্রধান বক্তা ছিলেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আরএসএস (RSS)-এর পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের সহ-প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু।
স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে আয়োজিত এই সভায় সাহিত্যানুরাগীদের উপস্থিতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চমক ছিল গিল্ডের দুই শীর্ষ পদাধিকারী— ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় এবং সুধাংশুশেখর দের উপস্থিতি। যে নতুন সংগঠন গিল্ডের হাত থেকে বইমেলার রাশ কেড়ে নিতে পারে বলে জল্পনা ছিল, সেই সংগঠনের সভাতেই গিল্ড কর্তাদের সশরীরে হাজির হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রকাশনা মহলে শোরগোল পড়ে যায়।
‘মিলেমিশে’ আয়োজন ও ‘ভারতীয়ত্বের’ বার্তা
গিল্ড কর্তাদের সামনে রেখেই শমীক ভট্টাচার্য বুঝিয়ে দেন যে, বইমেলার আয়োজনের ধরন এবার আমূল বদলাতে চলেছে। তবে বিজেপি বা কোনো বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠন মেলা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং গিল্ডকে অন্য সংগঠনগুলির সাথে ‘মিলেমিশে’ কাজ করতে হবে।
শমীক ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে বলেন:
“বাংলার বইমেলা সারা ভারতের মানুষের কাছে একটি নির্দিষ্ট আবেগ। তবে মেলা পরিচালনা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে জায়গা না-পাওয়া সহ কিছু ক্ষোভ বা সমালোচনা থাকে। যেকোনো বড় কাজে সামান্য বিচ্যুতি থাকা স্বাভাবিক। তবে আমরা এখানে বইমেলা বা প্রকাশকদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে আসিনি। আমরা চাই, সবাই মিলেমিশে নতুনভাবে মানুষের সামনে কিছু উপস্থাপিত করব।”
পূর্বতন বাম ও তৃণমূল জমানার সমালোচনা করে তিনি যোগ করেন, সাহিত্য জগতে দীর্ঘকাল ধরে একটা ‘রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা’ কাজ করেছে, যেখানে সব মতাদর্শের স্থান ছিল না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেই একই ধারা বহাল থাকুক তা তাঁরা চান না। তাঁর কথায়, “রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জায়গা বইমেলা নয়। আমরা চাই, আগামী দিনে যে বইমেলা হবে, তাতে যেন সম্পূর্ণ একটা ভারতীয়ত্বের ছাপ থাকে।”
বিজিপি নেতৃত্বের অবস্থান ও ‘মুক্ত পরিবেশের’ দাবি
বিজিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারও সভাপতির সুরেই কথা বলেন। বইমেলার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি না করলেও মেলা যে তাঁদের ভাবনানুযায়ী হতে হবে, তা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “মুক্ত জায়গা ছাড়া লেখা বা নাটক হয় না। আমরা সেই মুক্ত পরিবেশের শুরু দেখতে চাই।” অন্যদিকে, সংগঠনের আরেক শীর্ষ পদাধিকারী তথা রাজ্য বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া সেলের প্রধান সপ্তর্ষি চৌধুরী বিজিপি বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “বিজেপি রাজ্য সভাপতি যা বলেছেন তা স্পষ্ট। বিজিপি দায়িত্ব নেবে কি না, তা সময়ই বলবে।”
আপসের পথে ‘গিল্ড’, আপত্তি নেই যৌথ আয়োজনে
পরিস্থিতি অনুধাবন করে গিল্ডের শীর্ষ কর্তা সুধাংশুশেখর দে-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিজিপি-কে সাথে নিয়ে চলতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।
সভা শেষে মহাজাতি সদন থেকে বেরোনোর সময় সুধাংশুশেখর বলেন, “গিল্ডই এতদিন বইমেলা করেছে এবং আমরা সবসময় অন্যদের সাথে নিয়েই চলেছি। একটা সময় ন’টি সংগঠন বইমেলার সাথে যুক্ত ছিল। এখন আরও চারটি যুক্ত হলো। অর্থাৎ এবার মোট ১৩টি সংগঠন একসাথে কাজ করবে। নতুন কেউ যুক্ত হয়ে যদি আরও ভালো কাজ হয়, তবে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।” গিল্ড কর্তাদের এই নমনীয় মনোভাবের পর এটা স্পষ্ট যে, আগামী কলকাতা বইমেলায় বড় ধরনের সাংগঠনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে পেতে চলেছেন গ্রন্থপ্রেমীরা।

