মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বা ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ বহাল রাখার পক্ষে এক ঐতিহাসিক রায় দিল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার মার্কিন শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ ৬-৩ ভোটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ (এগজিকিউটিভ অর্ডার) বাতিল করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, আমেরিকার মাটিতে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুরই নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে, যা সে দেশের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই: সুপ্রিম কোর্ট
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের এই ১৪তম সংশোধনীতেই পরিবর্তন আনতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল ‘আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন’-সহ একাধিক মানবাধিকার সংগঠন ও আবেদনকারী পক্ষ। আদালতে তাদের যুক্তি ছিল, আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টের একার ক্ষমতাবলে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী পরিবর্তন করার এক্তিয়ার নেই।
আবেদনকারী পক্ষের এই যুক্তির সারবত্তা মেনে নিয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায় ঘোষণা করতে গিয়ে নাগরিকত্বকে “অধিকার পাওয়ার অধিকার” বলে অভিহিত করেন। প্রধান বিচারপতি রবার্টস বলেন, “১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা সেই প্রতিশ্রুতি ‘এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির’ জন্য সম্প্রসারিত করেছিলেন। আমরা আজ সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।” একই সাথে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ‘জুস সোলি’ আইন
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পরেই সে দেশের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ১৫৭ বছরের পুরনো আইন বদলানোর ঘোষণা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিগত বছরের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয়বারের জন্য হোয়াইট হাউসে প্রবেশের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এই প্রক্রিয়া শুরু করে দেন এবং গত ২১ জানুয়ারি এই সংক্রান্ত এক সরকারি নির্দেশনামায় (নির্বাহী আদেশ) স্বাক্ষর করেন।
উল্লেখ্য, আমেরিকার আইনে জন্মসূত্রের এই নাগরিকত্বকে বলা হয় ‘জুস সোলি’ (Jus Soli), যা একটি ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ হলো ‘মাটির অধিকার’। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, সেখানে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুকে স্বাভাবিক নিয়মে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়— এমনকি সেই শিশুর বাবা-মা অন্য দেশের নাগরিক বা অবৈধ অভিবাসী হলেও সে জন্মসূত্রে আমেরিকার পূর্ণ নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী। ১৮৬৮ সালে ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই আইনটিকে মার্কিন সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
অভিবাসন নীতিতে বড় ধাক্কা ট্রাম্প প্রশাসনের
নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছিলেন যে, এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার আইনের কারণেই আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসী সমস্যা ও অনুপ্রবেশের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানরা যাতে মার্কিন মাটিতে জন্মালেও নাগরিকত্ব না পায়, তা নিশ্চিত করাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে ট্রাম্পের সেই কঠোর অভিবাসন নীতি বড়সড় ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।

