বিরোধী হয়েও ‘চুরি’! সই-কাণ্ডে নালিশ করা দুই বিধায়কের নাম মুখ্যমন্ত্রী জানাতেই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে তাড়িয়ে দিল তৃণমূল

বিরোধী হয়েও ‘চুরি’! সই-কাণ্ডে নালিশ করা দুই বিধায়কের নাম মুখ্যমন্ত্রী জানাতেই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে তাড়িয়ে দিল তৃণমূল

রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন মোড়। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্বাক্ষর জালের (সই-কাণ্ড) অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ। এই ঘটনার জল গড়াল থানা থেকে সিআইডি (CID) তদন্ত পর্যন্ত। আর এই সই-কাণ্ডের জেরে সোমবারই নিজেদের দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (উলুবেড়িয়া পূর্ব) এবং সন্দীপন সাহাকে (এন্টালি) দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কার করল তৃণমূল কংগ্রেস।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “গত ১৫ বছরের শাসনে এদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রধান অভিযোগ ছিল দুর্নীতি। ক্ষমতা হারানোর পরেও এদের চুরির অভ্যাস কাটেনি। এরা ‘ভেটেরান’ চোর।”

বিধানসভায় সই-বিতর্কের সূত্রপাত

গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর, ৬ মে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে বিধায়কদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১৩ ও ১৪ মে বিধানসভায় বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতার নাম প্রস্তাব করে স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দিতে হয়। ১৯ মে কালীঘাটে পুনরায় বৈঠক ডেকে বিধায়কদের সই সংগ্রহ করে ৭০ জনের একটি প্রস্তাবপত্র বিধানসভার সচিবালয়ে জমা দেয় তৃণমূল।

বিতর্কের সূত্রপাত এখানেই। বিধানসভার সচিব পরীক্ষা করে দেখেন, ওই প্রস্তাবপত্রে অনেক বিধায়কের নাম বড় অক্ষরে লেখা, কারও আবার কেবল আদ্যক্ষর সই করা। শপথগ্রহণের দিনের হাজিরা খাতার সইয়ের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় জনাকুড়ি বিধায়কের স্বাক্ষর মিলছে না। সই জালের এই গুরুতর অভিযোগে বিধানসভার সচিবালয় হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর (FIR) দায়ের করে।

সিআইডি তদন্তের মুখোমুখি বিধায়কেরা

মামলাটি সিআইডি-র হাতে যাওয়ার পর তদন্তকারীরা চৌরঙ্গীর বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলেঘাটার কুণাল ঘোষ, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি এবং ক্যানিং পূর্বের বাহারুল ইসলামের বাড়িতে যান।

তদন্তের মুখে বাহারুল ইসলাম স্বীকার করেন যে, ৬ মে-র বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তিনি ভাঙড়ে নিজের বাড়িতেই ছিলেন। অথচ বিধানসভায় জমা পড়া ৬ মে-র তারিখ যুক্ত নথিতে তাঁর নাম বা সই রয়েছে। বাহারুল বলেন, “তদন্তকারীদের জানিয়েছি ওই দিন আমি কোনও মিটিংয়ে যোগ দিইনি।” অন্যদিকে, বালিগঞ্জের বিধায়ক তথা প্রস্তাবিত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বাহারুল সইটি দেখে বলেছেন ওটা ওঁর নয়। তবে আমরা কাউকে জোর করে সই করাইনি।” রবিবার এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ক্ষোভ প্রকাশ করে চৌরঙ্গীর বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সই জাল বলবেন না, আমি কোনও সই করিনি, নিজের নাম লিখেছিলাম।”

এই সই-কাণ্ডের সূত্র ধরেই সোমবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করেছিল সিআইডি। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি হাজির হননি। পরবর্তীতে সিআইডি প্রতিনিধিদল তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে নোটিস দিতে গেলে, অফিসের এক কর্মীর মাধ্যমে অভিষেক নোটিস গ্রহণ করেন এবং বয়ান রেকর্ড করার জন্য সপ্তাহ দুয়েকের সময় চেয়েছেন।

ঋতব্রত-সন্দীপনের বহিষ্কার ও শুভেন্দুর বক্তব্য

সোমবার নবান্নে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী খোলসা করেন যে, তৃণমূলের দুই নবাগত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাই প্রথম স্পিকারের কাছে এই সই জালের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এখানে বিজেপির কোনও ভূমিকা নেই। দুই বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ এফআইআর করেছে এবং পুলিশমন্ত্রী হিসেবে আমি সিআইডি-কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।” তিনি আরও জানান, সই বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুরো নথির ফরেনসিক পরীক্ষা করানো হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শুভেন্দুর এই সাংবাদিক বৈঠকের কিছুক্ষণের মধ্যেই তৃণমূল ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। বহিষ্কৃত হওয়ার পর দুই বিধায়ক দাবি করেন, অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করা এবং ‘সত্য’ বলার জন্যই তাঁদের এই শাস্তি পেতে হলো। ঋতব্রত ও সন্দীপনের অভিযোগ, ৬ মে-র বৈঠকে কেবল উপস্থিতির খাতায় সই করানো হয়েছিল, কোনও রেজলিউশন বা প্রস্তাব নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সেই উপস্থিতির খাতার সই জালিয়াতি করে রেজলিউশনে বদলে দেওয়া হয়েছে এবং অনুপস্থিত বিধায়কদের জায়গায় নাম বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তৃণমূলের অন্দরে প্রতিক্রিয়া ও মমতার আক্ষেপ

দুই বিধায়কের বহিষ্কারের পর বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁদের তীব্র সমালোচনা করেন। দুই বিধায়ককে ‘সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে কুণাল বলেন, “ফুটবল দলের মতো ফল প্রকাশের এক মাসও হয়নি, তার আগেই দলে বিদ্রোহ? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হলে এরাই মন্ত্রী হওয়ার জন্য লবি করতেন।”

অন্যদিকে, এই বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “এই দু’জনকে টিকিট দেওয়াই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।” বিশেষ করে ঋতব্রতকে ‘নীতিহীন’ মানুষ বলে কটাক্ষ করে ২০১৭ সালে তাঁকে বহিষ্কার করার জন্য সিপিএমের প্রশংসা করেন মমতা। তিনি আরও যোগ করেন, “যাঁরা টাকার মোহে বা ভয়ে বিজেপিতে যাওয়ার মনস্থির করেছেন, তাঁরা তৃণমূল ভাঙার চক্রান্ত করছেন। মনে রাখবেন, আপনারা যদি এই খেলা খেলেন, আমি কিন্তু আরও বড় খেলোয়াড়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.