তারাতলা বিপর্যয়কাণ্ড: জেরা ও তল্লাশিতে প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি কালীচরণ, ‘টিমওয়ার্ক’-এর নেপথ্যে ‘অধিনায়ক’ কে, খুঁজছে পুলিশ

তারাতলা বিপর্যয়কাণ্ড: জেরা ও তল্লাশিতে প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি কালীচরণ, ‘টিমওয়ার্ক’-এর নেপথ্যে ‘অধিনায়ক’ কে, খুঁজছে পুলিশ

দক্ষিণ কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিপর্যয়ের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তদন্তকারীরা এটিকে একটি ‘টিমওয়ার্ক’ বা সুসংগঠিত চক্রের কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই অনিয়মের ‘টিমে’ আর কে কে ছিলেন বা এর ‘অধিনায়ক’ কে, তা জানতে ধৃত কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দফায় দফায় জেরা করছে পুলিশ। যদিও পুলিশি জেরার মুখে ধৃত কালীচরণের একটাই চেনা জবাব, “আমি কিছু জানি না।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ইঙ্গিত ও হেফাজতের মেয়াদ

গত ২৫ জুন তারাতলাকাণ্ডে গ্রেফতার হন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর গ্রেফতারির আগে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছিলেন, “কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান (পাশ) হয় না।” আলিপুর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত কালীচরণকে পুলিশি হেফাজতে থাকতে হবে।

আদালতের বিগত শুনানিতে সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল জানান যে, ধৃত কালীচরণ পুরসভায় কী কী কাজ করতেন তার স্পষ্ট আভাস কেস ডায়েরিতে রয়েছে। পুলিশের দাবি, পুরসভার যেকোনো নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো জটিলতা বা প্রশ্ন থাকলে, তা করিয়ে দিতেন এই কালীচরণই। গত শুক্রবারের শুনানিতে তদন্তকারীরা ‘টিমওয়ার্ক’ শব্দের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে জানান, এই দুর্নীতির নেপথ্যে একা কালীচরণ নন, আরও অনেকে জড়িত রয়েছেন এবং তাঁদের খোঁজ চালানো হচ্ছে।

হাওড়ার ফ্ল্যাটে ‘সিট’-এর তল্লাশি ও পুরকর্মীদের জেরা

রবিবার কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) ধৃত কালীচরণকে সাথে নিয়ে হাওড়ার শিবপুরে তাঁর ফ্ল্যাটে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে এক ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চালায়। পুলিশ সূত্রে খবর, ওই ফ্ল্যাট থেকে কালীচরণের মোবাইল ফোনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই সমস্ত নথি সরাসরি তারাতলাকাণ্ডের না হলেও, পুরসভা সংক্রান্ত এই নথিগুলি তদন্তের স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

এর পাশাপাশি, কালীচরণকে গ্রেফতারের পর কলকাতা পুরসভার সঙ্গে যুক্ত আরও ছয়জন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ, যাঁদের প্রায় সকলেই ‘লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়ার’-এর সাথে যুক্ত।

নথিতে খোদ প্রাক্তন মেয়রের সই, তদন্তে পোর্ট ট্রাস্ট ও পুরসভা

তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তারাতলার বিপর্যস্ত নির্মীয়মাণ গুদামটির কলকাতা পুরসভার অনুমোদন ছিল। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জানিয়েছেন যে, ওই গুদামের অনুমোদনপত্রে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সই ছিল। তবে এই বিষয়ে তাঁর প্রাক্তন ওএসডি-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখছেন।

তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পুলিশ একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:

  • গুদাম তৈরির আগে উপযুক্ত ‘সয়েল টেস্ট’ বা মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা জানতে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
  • কোনো পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং গুদাম তৈরিতে অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করা হচ্ছিল কি না, তা জানতে কলকাতা পুরসভাকে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ।

হতাহতের সংখ্যা ও অন্যান্য গ্রেফতারি

তারাতলা বিপর্যয়ের পর কলকাতা পুলিশ একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে। প্রাথমিক এফআইআর-এ (FIR) মোট পাঁচজনের নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রধান ঠিকাদার আসগর হুসেনের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি চারজনকেই ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে অন্যতম হলেন গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহরা এবং ছাদ তৈরির দায়িত্বে থাকা ‘অয়ন ট্রেডার্স’-এর বিল্ডিং সুপারভাইজার মহম্মদ গুলজার। শম্ভুনাথ বেহরার অফিস থেকে গুদাম সংক্রান্ত বহু নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার সময় গুদামে ঠিক কতজন শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন, তা জানতে জখম শ্রমিকদের বয়ান রেকর্ড করছে পুলিশ। গুদামটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ‘রেজিস্টার’ না থাকায় সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে জখম ও নিহত মিলিয়ে মোট ৩৩ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকার্য ও তদন্তের প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে জারি রেখেছে লালবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.