বকেয়া ডিএ থেকে পে কমিশন, আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, বৈঠকশেষে জানাল সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন

বকেয়া ডিএ থেকে পে কমিশন, আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, বৈঠকশেষে জানাল সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত পুঞ্জীভূত অসন্তোষ ও জট কাটানোর লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিশেষ উদ্যোগে নবান্নে রাজ্যের চারটি প্রধান সরকারি কর্মচারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকে যৌথ সংগ্রামী মঞ্চের পাশাপাশি কনফেডারেশন অফ গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়, ইউনিটি ফোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী পরিষদের শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। বকেয়া ডিএ, নতুন পে কমিশন গঠন, শূন্যপদে নিয়োগ এবং অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীকরণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ওপর এই বৈঠকে সবিস্তার আলোচনা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে সংগঠনগুলির প্রায় প্রতিটি দাবিদাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।

২২ জুনের বাজেটে ডিএ নিয়ে বড় ঘোষণার সম্ভাবনা

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলির দাবি, বিগত জমানার মতো ডিএ সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়টিকে আর ঝুলিয়ে না রেখে সরকার এবার বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কর্মচারী প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, বকেয়া ডিএ-র একটি বড় অংশ ধাপে ধাপে মিটিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু মূল ধারার রাজ্য সরকারি কর্মচারীরাই নন, গ্র্যান্ট-ইন-এড বা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এই বিশেষ আর্থিক সুবিধার আওতায় আসবেন।

রূপরেখা ও পে কমিশন নিয়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি: আগামী ২২ জুন অনুষ্ঠিত হতে চলা রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনেই বকেয়া ডিএ পরিশোধের স্পষ্ট রূপরেখা সহ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে পারে সরকার। একই সঙ্গে বৈঠকে জানানো হয়েছে, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই রাজ্যে নতুন পে কমিশন (Pay Commission) কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট কমিশনকে দ্রুত তাদের সুপারিশপত্র ও নীতিগত প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফে। ভবিষ্যতে ডিএ প্রদান নিয়ে যাতে কোনও অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়, তার জন্য একটি স্থায়ী সরকারি আদেশনামা (Standing Order) জারিরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলি।

ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার পদে স্বচ্ছ নিয়োগ

ডিএ ও পে কমিশনের পাশাপাশি রাজ্যের কর্মসংস্থান ও শূন্যপদ পূরণের ক্ষেত্রেও একটি বড় ঘোষণা করা হয়েছে এই বৈঠকে। সরকারি সূত্রের খবর, আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে প্রায় ৫০ হাজার শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখতে আগামী ৬ জুনের মধ্যে একটি নতুন ও আধুনিক ‘স্বচ্ছ নিয়োগ নীতি’ চালু করবে রাজ্য সরকার। এই উদ্দেশ্যকে সফল করতে বিভিন্ন নিয়োগকারী বোর্ড ও পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাগুলির পুনর্গঠনের কাজও ইতিমধ্যেই শুরু করা হয়েছে।

অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা

বৈঠকে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক (Contractual) কর্মীদের বেতন কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত এবং জোরালো আলোচনা হয়। কর্মচারী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত এ রাজ্যের অস্থায়ী কর্মীদের অন্যান্য প্রগতিশীল রাজ্যের সমপর্যায়ের বেতন ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন স্কিমে কর্মরত অস্থায়ী কর্মীদের সম্মানজনক বেতনবৃদ্ধি ও তাঁদের স্থায়ীকরণের দাবিও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়।

“আলোচনার পরিবেশ ইতিবাচক”, সন্তোষ প্রকাশ সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই দীর্ঘ বৈঠকের পর কর্মচারী সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চের পক্ষ থেকে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে জানান:

“দীর্ঘদিন পর সরকারের সঙ্গে সরাসরি টেবিলে বসে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলো। মুখ্যমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে এই বৈঠক ডাকায় অত্যন্ত ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, এই আলোচনা এখানেই শেষ নয়; ভবিষ্যতেও নিয়মিত ব্যবধানে কর্মচারী সংগঠনগুলির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলবে। প্রয়োজনে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি ও আইনি সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা হবে।”

দীর্ঘদিন ধরে চলা ডিএ আন্দোলন এবং আইনি লড়াইয়ের আবহে সরকারের এই নমনীয় ও ইতিবাচক অবস্থানকে রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। এর ফলে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানে এক নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.