মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুরের মাঝে রেলগেটে স্কুলভ্যানে ট্রেনের ধাক্কার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই প্রকাশ্যে আসছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রেলের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, গেটম্যানের গাফিলতির কারণেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইতিপূর্বেই পুলিশ অভিযুক্ত গেটম্যান অনুপ কর্মকারকে গ্রেফতার করেছে। তবে এই ঘটনার দায় নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ধৃত গেটম্যান। তাঁর পাল্টা দাবি, ডাউন লাইনে ট্রেন আসার কোনো খবর স্টেশন মাস্টার তাঁকে দেননি এবং ওই সময়ে সিগন্যালও লাল ছিল।
গত শুক্রবার কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুরের মাঝের একটি রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় ডাউন লাইনের একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন সজোরে ধাক্কা মারে একটি স্কুলভ্যানকে। দুর্ঘটনার তীব্রতায় গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এই ঘটনায় ভ্যানের চালক ও আটজন পড়ুয়া গুরুতর জখম হয় এবং ঘটনাস্থলেই এক সাইকেল আরোহীসহ চার শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। উত্তেজিত জনতার মারধরে জখম হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অভিযুক্ত গেটম্যান অনুপ।
হাসপাতাল শয্যা থেকে গেটম্যানের বয়ান
হাসপাতালের বেডে শুয়েই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অনুপ কর্মকার। স্টেশন মাস্টারের দিকে আঙুল তুলে তিনি বলেন:
“প্রতিদিনের মতো আপ ও ডাউন লাইনের ট্রেনের নম্বর আমার কাছে ছিল। নিয়ম অনুযায়ী আপ লাইনের ট্রেন স্টেশন ছাড়ার সময় কর্ণসুবর্ণের স্টেশন মাস্টার আমাকে ফোন করে খবর দিয়েছিলেন, যাতে আমি গেট বন্ধ করতে পারি। কিন্তু ডাউন লাইনের প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি স্টেশন থেকে ছাড়ার কোনো খবরই আমাকে দেওয়া হয়নি। ওই সময়ে ডাউন লাইনের সিগন্যালও লাল ছিল।”
অনুপের আরও দাবি, তাঁর কেবিন থেকে ডাউন লাইনে কোনো ট্রেন আসছে কিনা তা বোঝার উপায় নেই। তিনি ভাবেন ডাউন লাইনের ট্রেনটি তখনও স্টেশন ছাড়েনি এবং হাতে ৫-১০ মিনিট সময় রয়েছে। সেই কারণেই তিনি গেটটি খুলেছিলেন। পাশাপাশি, প্যাসেঞ্জার ট্রেনের চালক কোনো হর্ন বাজাননি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ ও রেলের ভূমিকা
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, এই রেলগেটে প্রায় প্রতিদিনই আপ ও ডাউন লাইনের দুটি ট্রেন একসঙ্গে পার করানো হয়। শুক্রবার আপ লাইনের হাওড়াগামী নবদ্বীপ এক্সপ্রেস চলে যাওয়ার পর ডাউন লাইনের ট্রেনের জন্য গেট বন্ধ রাখার কথা ছিল। কিন্তু দুই ট্রেনের মাঝের সময়ে গেট খুলে দেওয়ায় গেটম্যানের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, গেটম্যানের চরম অসতর্কতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ঘটনার সময় গেটম্যান মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। তবে হাসপাতাল সূত্রের খবর, প্রাথমিক তদন্তে ধৃত গেটম্যানের মত্ত অবস্থায় থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আসল দায় কার—স্টেশন মাস্টারের সমন্বয়ের অভাব নাকি গেটম্যানের কর্তব্যে গাফিলতি, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে রেল প্রশাসন।

