প্রথা মেনে এ বছরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রের গুণী ও কৃতী ব্যক্তিত্বদের এক ছাদের তলায় এনে চাঁদের হাট বসাল ‘বছরের বেস্ট ২০২৬’-এর সন্ধ্যা। অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক বক্তৃতায় ঐতিহ্য ও অতীতের চেয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও ব্যক্তিত্ব অভীক সরকার। তবে ‘পরিবর্তন’ শব্দটির রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা এড়াতে এ দিন শুরুতেই তিনি কিঞ্চিৎ সাবধানতা অবলম্বন করেন।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে অভীক সরকার স্পষ্ট ঘোষণা করেন, “পরিবর্তনের কথা বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু বলব না। শব্দটা ব্যবহার করলেই অনেকে মনে করতে পারেন যে, আমরা একটা রাজনৈতিক পক্ষ নিচ্ছি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, অত্যন্ত সযত্নে এই অনুষ্ঠানকে সর্বদা রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। তাঁর এক সহকর্মীর উদ্ধৃতি দিয়ে মঞ্চটিকে তিনি বর্ণনা করেন— “এক মঞ্চ, সব পক্ষ।”
২০১১-র মতো রাজ্যে আবার আশার আলো
অনুষ্ঠানকে সরাসরি রাজনীতির আওতামুক্ত রাখলেও রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও পরিবর্তনের আবহাওয়া নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি অভীকবাবু। প্রারম্ভিক বক্তৃতায় তিনি মন্তব্য করেন, “এটা তো ঠিক, রাজ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আবার একটা আশার আলো এসেছে। ঠিক যেমনটা এসেছিল ২০১১ সালে।” তিনি জানান, মূলত বাঙালির সেই পরিবর্তনের স্পৃহাকেই উদ্যাপন করছে ‘বছরের বেস্ট’ সন্ধ্যা।
বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও বাঙালির প্রতিবাদ নিয়ে পর্যবেক্ষণ
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করা কৃতীদের হাতে সম্মান তুলে দেওয়ার আগে বাঙালির প্রতিবাদী চরিত্র নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ৮১ বছর বয়সী অভীক সরকার। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “প্রতিবাদ বাঙালির জীবনে নেই। অনেক দিন থেকেই নেই।”
এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বাম জমানা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ভূমিকার সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, পৃথিবীর সব প্রান্তেই প্রতিবাদের নেতৃত্ব আসে প্রতিষ্ঠানবিরোধী শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছ থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানায় বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা ‘আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে’ গচ্ছিত রেখেছিলেন। আবার তৃণমূলের জমানায় তাঁদের প্রায় সকলেই শাসকদলপন্থী হয়ে উঠেছেন। দুই-একজন ব্যতিক্রমী চরিত্র ছাড়া অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই সর্বদা সরকারপন্থী ভূমিকা নিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
অমাবস্যার মাঝে আলোর ঝিলিক
বুদ্ধিজীবীদের একাংশের এই শাসকঘেঁষা মনোভাবকে ‘ঘোর অমাবস্যা’র সঙ্গে তুলনা করলেও, এর মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অভীক সরকার। তিনি বলেন, “এই ঘোর অমাবস্যায় কিছু আলোর ঝিলিক আছে। আজকের সন্ধ্যায় এরকম কয়েক জনের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।”
জীবনের আটটি দশক পেরিয়েও তরুণসুলভ উদ্দীপনা নিয়ে মাও সে তুঙের (মাও জ়ে দং) বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, “একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হতে পারে। সেই দাবানলের আশায় আমরা আজকের অনুষ্ঠানকে উৎসর্গ করছি।”
রং, ছবি, বিজ্ঞান, ব্যবসা ও সাহিত্যের মতো নানা জগতের নক্ষত্রদের উপস্থিতিতে এ বারের ‘বছরের বেস্ট’ মঞ্চটি একদিকে যেমন শাসক ও বিরোধী সব পক্ষকে এক সুতোয় বেঁধেছে, তেমনই বাঙালির চিন্তন ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।

