লোকসভার আসন্ন বাদল অধিবেশন শুরুর মাত্র দু’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করলেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার দিল্লির ৭, লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এই সাক্ষাৎ পর্বটি সম্পন্ন হয়। সংসদের অধিবেশন শুরুর ঠিক প্রাক্কালে এই বৈঠককে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে কৌতূহল ও জল্পনা তীব্র হয়েছে।
সম্প্রতি লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ দল থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই) নামক নতুন দলে যোগ দিয়েছেন। নতুন এই দল সংসদে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) জোটকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লোকসভায় এই এনসিপিআই দলের দলনেতা নির্বাচিত হয়েছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন সমীকরণের আবহে প্রধানমন্ত্রী ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পৃথক বসার অনুমতি স্পিকারের
প্রথা অনুযায়ী সোমবার থেকে শুরু হতে চলা বাদল অধিবেশনের আগে রবিবার সংসদে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেই বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য এনসিপিআই-কেও আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। লোকসভার অধিবেশন চলাকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদদের থেকে আলাদা বসেন এনসিপিআই-এর সাংসদেরা। সংবাদসংস্থা এএনআই (ANI) সূত্রে জানা গেছে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ইতিমধ্যে এনসিপিআই সাংসদদের পৃথক বসার এই আবেদনে অনুমোদন দিয়েছেন। ফলে আসন্ন অধিবেশনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা মহুয়া মৈত্রদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আসনে বসবেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষদস্তিদার ও শতাব্দী রায়রা।
সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ ও কেন্দ্রের চিঠি
সংসদীয় কার্যপ্রণালী সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে শনিবার কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এনসিপিআই-এর লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে রিজিজু লিখেছেন:
“সর্বদলীয় বৈঠকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি আনন্দিত। সংসদের উভয় কক্ষের কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমি আপনার সহযোগিতা কামনা করছি।”
একই সঙ্গে সর্বদলীয় বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে লোকসভায় এনসিপিআই-এর মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ) কাকলি ঘোষদস্তিদারকেও।
ক্ষুব্ধ তৃণমূল কংগ্রেস, ‘গণতন্ত্রের প্রহসন’ বলে কটাক্ষ ডেরেকের
তৃণমূলের এই সাম্প্রতিক ভাঙন এবং দলত্যাগীদের সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে কালীঘাট শিবির। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। সমাজমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি একে “প্রতারণা” ও “গণতন্ত্রের প্রহসন” বলে আখ্যা দেন। ডেরেক লেখেন:
“গণতন্ত্রকে ঠাট্টার পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। স্পিকার যেখানে এই ২০ জন দলত্যাগী সাংসদকে এখনও (কাগজে-কলমে) তৃণমূল সাংসদ হিসেবেই উল্লেখ করছেন, তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই মোদী-শাহের মন্ত্রিসভার এক সদস্য ওই দলত্যাগীদের এনসিপিআই সদস্য হিসেবে অভিহিত করে সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান।”
দেশজুড়ে বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, জাতীয় স্তরে একাধিক বিরোধী দলেই ভাঙন দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) শিবিরে ভাঙন ধরেছে, অন্যদিকে আম আদমি পার্টির (AAP) রাজ্যসভার সাতজন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদও বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এই পরিবর্তিত ও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভূমিতে রবিবারের সর্বদলীয় বৈঠক এবং সোমবার থেকে শুরু হতে চলা সংসদের বাদল অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তপ্ত হতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

