ব্রিগেডে ‘মিনি দক্ষিণেশ্বর’: বাঙালির মন জয় করতে মোদীর সভামঞ্চে কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

ব্রিগেডে ‘মিনি দক্ষিণেশ্বর’: বাঙালির মন জয় করতে মোদীর সভামঞ্চে কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক— বিজেপি কি ‘বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী’? এই পরিচিতি ঝেড়ে ফেলে নিজেদের ‘বাঙালিয়ানা’র প্রমাণ দিতে ২০২৬ বিধানসভা ভোটের আগে মাস্টারস্ট্রোক দিল গেরুয়া শিবির। শনিবার ব্রিগেডের মেগা সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য যে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে, তা অবিকল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে। রাজনৈতিক মহলের মতে, শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বঙ্গ-বিজেপির এই কৌশলগত পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


মঞ্চের আদল: দক্ষিণেশ্বর থেকে টেরাকোটা

বিজেপির এবারের ব্রিগেডের মূল আকর্ষণ হলো ১২০ ফুট বাই ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশালাকায় মঞ্চ।

  • মূল কাঠামো: মঞ্চের ঠিক মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে ভবতারিণী মন্দিরের অবিকল প্রতিচ্ছবি।
  • সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী: মঞ্চের দুই পাশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাঙালির কৃষ্টি ও লোকশিল্পের টুকরো ছবি। বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা শিল্প থেকে শুরু করে পটচিত্র, কীর্তন এবং বাউল সংস্কৃতির নানা উপাদানে সাজিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিটি কোণ।
  • স্লোগান: মঞ্চের ঠিক সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপির সরকার’।

‘জয় শ্রীরাম’ নয়, প্রাধান্য পাচ্ছে ‘জয় মা কালী’

সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপি নেতাদের গলায় হিন্দুত্বের পাশাপাশি বাঙালিয়ানার সুর চড়ছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের মুখে এখন ‘জয় শ্রীরাম’-এর চেয়েও বেশি শোনা যাচ্ছে ‘জয় মা কালী’। খোদ প্রধানমন্ত্রী তাঁর খোলা চিঠির শুরুতেই মা কালীকে স্মরণ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের ‘বহিরাগত’ তকমার জবাব দিতেই মা দুর্গা ও মা কালীকে সামনে রেখে বাঙালি আবেগে শান দিচ্ছে বিজেপি।


তৃণমূলের পাল্টা খোঁচা: ‘থিম পুজো’র মণ্ডপ

বিজেপির এই রাজকীয় আয়োজন দেখে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দলের দাবি, রাজনৈতিক সভাকে ‘থিম পুজো’র মণ্ডপে পরিণত করেছে বিজেপি। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “ওটা রাজনৈতিক মঞ্চ না কি থিমপুজো? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখনই তিনি দক্ষিণেশ্বর স্টেশনের টিকিট কাউন্টার ভবতারিণীর মন্দিরের আদলে তৈরি করেছিলেন। এ সব করে বাঙালির মন পাওয়া যাবে না।”


মেগা শনিবার: এক মঞ্চে জোড়া কর্মসূচি

শনিবার দুপুরে ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দুটি পৃথক কর্মসূচি রয়েছে: ১. সরকারি কর্মসূচি: ১৮,৮৬০ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন। ২. রাজনৈতিক সভা: ৯টি ‘পরিবর্তন যাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করে মেগা জনসভা।

প্রশাসনের তরফে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। লালবাজার সূত্রে খবর, প্রায় ৩,০০০ পুলিশ কর্মী মোতায়েন থাকছেন সভাস্থলে। ড্রোন ব্যবহারের বদলে বিশেষ নজরদারি বাহিনীর সাহায্যে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা হবে।


নজর কোন দিকে?

২০২১ সালের ৭ মার্চের পর আবার ব্রিগেডে ফিরছেন মোদী। কাকতালীয়ভাবে শনিবারের তারিখটি নন্দীগ্রাম দিবসের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। জনসভায় ভিড় কতটা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে কী কী নতুন প্রতিশ্রুতি দেন— এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।

রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সাফ কথা, “বাঙালি তো আকাশ থেকে পেড়ে আনা কিছু নয়। আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা ভারতীয়, তারপর বাঙালি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.