গত ৯ মে, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পথচলা শুরু করেছিল রাজ্যের নতুন সরকার। শপথগ্রহণের পর প্রথম এক সপ্তাহে বাংলায় প্রশাসনিক সংস্কার, জনকল্যাণমুখী প্রকল্প এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কতটা কাজ হলো, শনিবার তার খতিয়ান তুলে ধরল শাসকদল বিজেপি। নবান্নের একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের রূপায়ণ থেকে শুরু করে দুর্নীতি মামলায় হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি— প্রথম সাত দিনেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি পদ্মশিবিরের।
প্রথম ক্যাবিনেটেই বড় সিদ্ধান্ত: বিএসএফ-কে জমি ও কেন্দ্রীয় প্রকল্প
গত শনিবার সরকার গঠনের পর সোমবারই নবান্নে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রথম বৈঠকেই একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
- সীমান্ত সুরক্ষা: দেশ সুরক্ষায় জোর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ (BSF)-কে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- কেন্দ্রীয় প্রকল্প: পূর্বতন সরকারের জট কাটিয়ে অবশেষে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-সহ অন্যান্য সমস্ত কেন্দ্রীয় সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা।
গতি পেল রেল ও চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্প
নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের তত্ত্ব যে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে, তার প্রমাণ হিসেবে রেলের ছাড়পত্রকে তুলে ধরেছে বিজেপি। গত শুক্রবারই রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে পাঠানো এক চিঠিতে রাজ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেল প্রকল্পে সবুজসঙ্কেত দিয়েছেন। ১. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ির মধ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে ডবল লাইন নির্মাণ। ২. শালবনি থেকে আদ্রা পর্যন্ত ১০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে তৃতীয় লাইনের চূড়ান্ত সমীক্ষা বা ডিপিআর (DPR) তৈরির নির্দেশ। ৩. সাঁতরাগাছি থেকে খড়্গপুর হয়ে জয়পুর পর্যন্ত বিশেষ এক্সপ্রেস ট্রেন চালু।
পাশাপাশি, পূর্বতন সরকার ও পুলিশের অনুমতি না মেলায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজও অবশেষে শুরু হয়েছে। রেলমন্ত্রী এই সাফল্যের কৃতিত্ব ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারকে দিয়েছেন।
১ জুন থেকে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ ও দ্বিগুণ ভাতা
মহিলা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক বড় ঘোষণা করেছে নতুন সরকার, যা আগামী ১ জুন থেকে কার্যকর হতে চলেছে:
- অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার: মহিলাদের জন্য প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি পূরণে চালু হচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প। ১ জুন থেকে সরকারি বাসে মহিলারা বিনামূল্যে সফর করতে পারবেন।
- সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি: বার্ধক্য ভাতা ১,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২,০০০ টাকা করা হচ্ছে। একই সাথে প্রতিবন্ধী ভাতাও দ্বিগুণ করে ২,০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কার ও ‘বন্দে মাতরম’
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলতে একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে বিজেপি:
- ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে ইস্যু হওয়া সমস্ত জাতিগত শংসাপত্র (Caste Certificate) পুনরায় যাচাই (Verify) করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- রাজ্যের সমস্ত সরকারি স্কুলে প্রার্থনা সঙ্গীতের পাশাপাশি জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করে নির্দেশিকা জারি হয়েছে।
- দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা ‘ডব্লিউবিসিএস এগ্জিকিউটিভ’ (WBCS Executive) পরীক্ষা দ্রুত আয়োজনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
- ভিন্রাজ্যে আলুসহ অন্যান্য কৃষিজ পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের সমস্ত কড়াকড়ি তুলে নেওয়া হয়েছে।
- দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ ও তদন্তের জন্য সিবিআই-কে পূর্ণাঙ্গ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ভিআইপি নিরাপত্তা ছাঁটাই ও হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অপ্রয়োজনীয় ‘নন-ক্যাটেগরাইজড’ সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী একজন সাধারণ সাংসদ যেটুকু সরকারি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এখন সেটুকুই পাচ্ছেন।
পাশাপাশি, গত এক সপ্তাহে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একাধিক ‘উল্লেখযোগ্য’ গ্রেফতারির খতিয়ান দিয়েছে শাসকদল:
- পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু এবং কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিংহের গ্রেফতারি।
- বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে একাধিক তৃণমূল নেতার গ্রেফতারি।
- কলকাতা পুলিশের অভিযানে কাশীপুর থেকে ঝাড়খণ্ডের এক প্রবীণ মাওবাদী নেত্রীর গ্রেফতার।
- ‘বাংলা পক্ষ’-র প্রধান গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি।
বিজেপির দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকার প্রমাণ করেছে যে, দুর্নীতি ও আইনহীনতার প্রশ্নে তারা আপসহীন। এই গতি আগামী দিনেও বজায় থাকবে বলে আশাবাদী পদ্মশিবিরের নেতৃত্ব।

