পাঁচ দেশ সফরের দ্বিতীয় চরণে দু’দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে আজ নেদারল্যান্ডস পৌঁছাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE) সফর শেষ করে ডাচ ভূমিতে পা রাখছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে ইউরোপের বুকে ভারতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সফরগুলির মধ্যে অন্যতম হতে চলেছে এটি। এই পাঁচ দেশীয় সফরে নেদারল্যান্ডস ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় রয়েছে সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি।
এই সফরের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে একটি নতুন “কৌশলগত অংশীদারিত্ব” (Strategic Partnership) চুক্তি স্বাক্ষর। আপাতদৃষ্টিতে ফ্রান্স, জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের মতো বৃহৎ শক্তির তুলনায় নেদারল্যান্ডসকে ছোট মনে হলেও, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
ডাচ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক ও কূটনৈতিক এজেন্ডা
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদী নেদারল্যান্ডসের সর্বকনিষ্ঠ ও প্রথম প্রকাশ্য সমকামী প্রধানমন্ত্রী রব জেটিনের সঙ্গে প্রথমবার এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন। এ ছাড়া ডাচ রাজপ্রাসাদে রাজা উইলিয়াম-আলেকজান্ডার ও রানি ম্যাক্সিমার সঙ্গেও তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা নয়, বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে জোর
বর্তমানে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, ৫৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করে নেদারল্যান্ডস বর্তমানে ভারতে চতুর্থ বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দুই দেশ এবার সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষা, উদ্ভাবন, জল ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তির সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে চলেছে।
ডাচ অ্যাগ্রি-টেক ও ভারতের প্রিসিশন ফার্মিং: কম সম্পদে বেশি উৎপাদন
নেদারল্যান্ডসের ভৌগোলিক আয়তন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চেয়েও ছোট হলেও, উন্নত প্রযুক্তির জোরে তারা আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি রপ্তানিকারক দেশ। উদ্ভাবন ও ‘প্রিসিশন ফার্মিং’-এর মাধ্যমে ডাচরা কৃষিকে এক উচ্চ প্রযুক্তির বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করেছে। ভারতের বিশাল বাজার, মেধা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ডাচ প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (পাঞ্জাব থেকে মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটক থেকে গুজরাট পর্যন্ত) দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে ২৫টি ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ কাজ করছে। এর উদ্দেশ্য হলো:
- স্মার্টার ফার্মিং বা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ।
- জলের দক্ষ ব্যবহার এবং উচ্চ ফলন নিশ্চিত করা।
- খাদ্য অপচয় হ্রাস করা।
- পরবর্তী প্রজন্মের কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে “কম সম্পদে বেশি উৎপাদন”-এর লক্ষ্যপূরণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভারতের সুস্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ভবিষ্যৎ গঠনে এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ইউরোপীয় কৌশলে ভারতের নতুন মাত্রা
ভৌগোলিক দিক থেকে রটারডাম বন্দরকে কেন্দ্র করে নেদারল্যান্ডস হলো সমগ্র ইউরোপের প্রধান লজিস্টিক্স হাব। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইউরোপ যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে, তখন ভারতের এই সফর দিল্লির বৃহত্তর ইউরোপীয় নীতিতে নতুন গতি যোগ করবে।
২০১৭ সালের পর এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির দ্বিতীয় নেদারল্যান্ডস সফর, যা দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা ও সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকে প্রমাণ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর ভারতের ‘নতুন ইউরোপ নীতি’র একটি নিখুঁত প্রতিফলন। ভারত এখন শুধু ইউরোপের বড় বড় সামরিক শক্তির সঙ্গেই নয়, বরং প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ ও প্রভাবশালী দেশগুলির সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়; আর এই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে নেদারল্যান্ডস।

