পর্ব ১ : ব্রতকথার সাতকাহন

অষ্টচাল অষ্টদূর্বা কলসপত্র ধরে ।
ইতুকথা একমনে শুন প্রাণ ভরে।।
ইতু দেন বর,
ধনে জনে বাড়ুক ঘর।।

হ্যাঁ ইতু পূজা। ওই রাঢ় অঞ্চলে যিনি ইবতি নামে পূজিতা হন। আর পূর্ববঙ্গের মানুষের নিকট যে পূজার নাম চুঙীর ব্রত। কেউ কেউ বলেন লক্ষ্মীর সাধ দেওয়া ব্রত। লক্ষ্মী অর্থাৎ অন্নদাত্রী ভূমি মাতা। মেয়েলি ব্রত কথা। ব্রত কথা প্রায় একরকম ও পূজার পদ্ধতিও। ইনি কোনো একটি অঞ্চলের লৌকিক দেবী নন। যদিও ইতু বা এঁতেল একজন লৌকিক দেবী তবুও তাঁর ব্যপ্তি সমগ্র বঙ্গ জুড়ে। এটা সত্য যে আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয়দের মধ্যে মানে প্রায় দক্ষিণ ও রাঢ় অঞ্চল জুড়ে এই পূজার যে ব্যাপক প্রচলন আছে তা পূর্ববঙ্গীয়দের মধ্যে নেই। নানান কুলীন দেবতার পূজার মধ্যে ইতুর অকৌলিন্যতা হয়ত তাকে ততটা চর্চা দিতে পারেনি। প্রসঙ্গত ইতু লক্ষ্মী রূপে পূজা হলেও উপাসনা করা হয় সূর্য রূপে। সুতরাং ইতু পূজাকে লৌকিক পদ্ধতিতে নিতান্তই নিজস্বভাবে প্রকৃতির উপাসনা বলাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি।

ইতু পূজা শস্য উৎপাদনের প্রতীক রূপে প্রতীক রূপে আমাদের নিকট উদ্ভাসিত হন। সেই সূত্রে তিনিই শ্রী বা লক্ষ্মী। কিন্তু শস্য লাভের জন্য মাটি , জল ও বাতাসের সঙ্গে প্রোয়জন হয় সূর্যালোকের। তাই এই ব্রত কথায় সূর্যদেবতারও উপাসনা করা হয়। আদিত্য এই শব্দ অপভ্রংশ হয়ে ইতু শব্দের উৎপত্তি বলেই বিদ্বজনগন মনে করেন।

অনেকেই তাঁদের মেয়ের নাম রাখেন ইতু। ইতু – মিতু দুই বোন। অনেকেই নদীয়া জেলার প্রচলিত ইষ্টকুমার বা ইতোকুমার পূজার সঙ্গে এই ব্রত ও পূজার মিল পেয়েছেন। যদিও ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে আদিত্য শব্দ কালে কালে ভাঙতে ভাঙতে ইতু হয়েছে ,তবুও হাওড়া জেলায় ইনি এঁতেল নামে পরিচিত।

এঁতেল বা ইতু বা ইবতি বা চুঙীর বা লক্ষ্মীর সাধ সবই মেয়েলি ব্রত। বাঙ্গালী গৃহে শস্যে ও পৃথিবীকে শ্যামলী করে তোলার জন্য পুরনারীগন যুগ যুগ ধরে এই ব্রত পালন করে আসছেন। প্রত্নতত্ত্ব ও লোক সংস্কৃতিবিদ তারাপদ সাঁতরা ” হাওড়া জেলার লোক উৎসব ” গ্রন্থে এই বিষয় বিস্তারিত লিখেছেন। ডক্টর পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর রচিত “পূজা পার্বণের উৎস ” গ্রন্থেও এই কথা উল্লেখ করেছেন।

সাধারণত কার্তিক সংক্রান্তির দিন এই পূজার সূচনা হয়…এক সংক্রান্তি থেকে আরেক সংক্রান্তি । কেউ মিউ ১ অঘ্রানেও শুরু করেন পূজা। এই কার্তিক, অঘ্রান মাস শস্যের সময় , ধন উপার্জনের চরম সময়। গ্রামের সুবিস্তীর্ন মাঠের

ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায়॥

      হাওয়ার নেশায় উঠল মেতে   দিগ্‌বধূরা ধানের ক্ষেতে--

রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে, মরি হা য় হা য় হায়॥

অন্য দিকে আলু ,কপি, মুলো , পালং, শসা, কলা, বীট, গাজর, লঙ্কা, টম্যাটো ইত্যাদি শাক সব্জির সম্ভার ভূমিমাতার অঞ্চলদেশ পরিপূর্ণ করে তোলে।তাই ইতু হলেন শস্য দেবীর অন্যতম রূপ, সে বিষয় সন্দেহ থাকে না। তাছাড়া বৈদিক মতে ভগবান সূর্যনারায়ন পত্নী দেবী ঊষাই শ্রী রূপে পূজিতা হতেন। তাছাড়া সূর্যের অপর নাম মিত্র। অগ্রহায়ণ মাসের সূর্যের নাম হয় মিত্র বা রবি। এই কারণে অগ্রহায়ণ মাসে রবিবারে ইতুর পুজো হয়। প্রাচীন পারস্যদেশে একসময় মিথু পুজো হতো।

মিত্র → মিতু ― ইতু…

তো এই ইতু দেবীর মূর্তি কেমন? নাঃ তেমন মূর্তি নেই।পুরুত লাগে না। গৃহের মেয়েরাই পূজা করেন।

একটি প্রশস্ত মৃত্তিকা সরায় মাটি ভরে তার উপরে পাঁচ কলাই ( ছোলা, মুগ,মটর, অড়হর,সর্ষে ) ,ধান শস্য, মান, কচু, কলমীলতা, হীনচে, হলুদ, আখ, শুষনি ইত্যাদির ছোট চারা বা মূল পুঁতে দেওয়া হয়। তার উপর দুই খানি ঘট জল ভরে রাখা হয়। অঘ্রানে ভোরে প্রতিদিন ও অঘ্রানের রবিবার উপোস করে ব্রতকথা পড়ে পূজা করা হয়। ঘটে জল ঢালা হয় মন্ত্র বলে-

হিংচে কলমি ল-ল করে
রাজার বেটা পক্ষী মারে…
মারুক পক্ষী উড়ুক চিল
সোনার কৌট ,রূপার খিল।

ওঁ ইতু লক্ষ্মী দেব্যায় নমঃ
ওঁ সূর্য দেব্যায় নমঃ

জল ঘটে ঢালার সময় মাটিতে পড়ে, ঘট উপচে পড়ে, ঘট চুঁইয়ে পড়ে। সরার মাটি সরস হয়। অঙ্কুরিত হয় শস্য। সারা মাস জল পেয়ে শাক শস্য গুলি বড় হয়ে ওঠে। সরা শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠে।

দুই দরিদ্র ব্রাহ্মণ কন্যা পিতা দ্বারা পরিত্যাজ্য হয়ে নিজেদেরকে নিজের মতো করে খুঁজে পাওয়ার লড়াই , আমিত্ব বা অহং বোধ ,ক্রোধ,লোভ ইত্যাদিকে পরিত্যাগ করা ও লক্ষ্যে স্থির থাকা একটি মানুষের জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে এই ব্রতকথার মূল বিষয়। অহং থাকলে সেখান থেকে লোভের জন্ম নেয়। সেখান থেকে পাপের জন্ম হয়। পাপ করলে মহামায়ার সংসারে ভাগ্যের পরিহাসে তার ফল এই ইহলোকে ভোগ করতে হয়। তাতে রাজা ভিখারি হয় । পুন্য ফলের মাধ্যমে ভিখারি রাজা হয়।

ইতু পূজার রীতি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় এটি আসলে একটি ব্রত উদযাপনের প্রক্রিয়া।এই ব্রত হল বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের সহজ পাঠের অনুশীলন। আলো,জল যে কৃষির নিমিত্ত একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান ,সেই জ্ঞান পরিশীলিত হয় যখন, ছোট্ট মাটির সরার মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া শস্য দানা ও শাক সবজি গুলি লতিয়ে বড় হয়ে ওঠে। তারা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ধাবিত হয়।

উপলব্ধি হয় যে জলে ভেজালেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ফসল দেয় না। তার জন্য মাটি, মাটির সরসতা সৃষ্টি হয় জল দিয়ে। তাই থেকেই বীজ খাদ্য পায়। অঙ্কুরিত হয়। তারপর বড় হয়ে মাটির উপরে উঠে এলে তার আলো, বাতাসের প্রোয়জন হয়। তার বৃদ্ধি ও শস্যবতী করার জন্য প্রতিদিন জল সিঞ্চন করতে হয়। তাই সারা অঘ্রান মাসের ঊষাকালে স্নান করে, পবিত্র হয়ে ইতু লক্ষ্মীর ঘটে মন্ত্র বলে জল দেওয়া হয়, পূজা করা হয়। অন্যদিন না হলেও অন্তত রবিবার ব্রতনপালন করে নিরামিষ খেতে হয়। কৃষি কাজেও বিভিন্ন পর্যায় আছে কঠোর নিয়ম । তাই ব্রতে একমাস ব্যাপী নিয়ম পালনের চর্চা হয়। এমনকি ব্রত কথাতেও সংযমের কথা বলা হয়েছে।

ইতুর জনপ্রিয় ব্রতকথাটি লিখিত ও মৌখিক দুই রূপেই মেলে। অধিকাংশ ব্রত-গল্পের মতো এই গল্পেরও অন্যতম প্রধান চরিত্র দরিদ্র ব্রাহ্মণ। উমনো ঝুমনো দুই মেয়ে। ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করে চাল-ঘি যোগাড় করেছে আসকেপিঠে খাওয়ার জন্য। কিন্তু বামনিকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে – উমনো ঝুমনোকে যেন একটাও না দেওয়া হয়। তবু স্ত্রীকে বিশ্বাস নেই। বার ঘরে বসে তাওয়ায় ছ্যাঁক করে আওয়াজ হয় আর গুনে রাখার জন্য দড়িতে গিঁট দেয় বামুন। এদিকে সুযোগ বুঝে উমনো ঝুমনোকে একটি পিঠে দুভাগ করে খাওয়ায় মা। সেই অপরাধে তাদের বনবাসে দেয় নিষ্ঠুর বাবা। এখানেই তারা ইতুপুজো করে রাজা ও মন্ত্রীকে বিয়ে করলে কী হবে, উমনো আর ইতুপুজো করে না। আবার কষ্ট নেমে আসে। অবশেষে ঝুমনোর তৎপরতায় ফিরে পায় সব কিছু।

ব্রতকথা থেকে প্রাচীন ইতিহাসের অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রথার সন্ধান মেলে। যেমন দড়িতে গিঁট মেরে মনে রাখার প্রথা প্রাচীন গ্রন্থিলিপিকে স্মরণ করায়। পেরু পলেনেশিয়া এমনকি প্রাচীন চীনেও এই লিপির প্রচলন ছিল। এর নাম কুইপান বা কুইপু লিপি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রতগল্পটিতে ইন্দো-ইউরোপীয় লোকগল্পের মোটিফগুলিও সুস্পষ্ট রূপে ধরা পড়েছে। যেমন – মেয়েদের বনবাসে পাঠানো, দুর্ভাগ্য জয় করে বাড়িতে পুনপ্রায় ফিরে আসা, বৃক্ষের অভ্যন্তরে আশ্রয় লাভ ইত্যাদি।

সারা মাস পূজার পর অঘ্রান সংক্রান্তির দিন শেষ পূজা হয় । ওই দিন ইতু লক্ষ্মীর ভোগে পাঁচ ফল, মিষ্টি ও কাঁচা পিঠে দেওয়া হয়। কাঁচা পিঠে হল নারকেল , চালগুঁড়ি মেখে কলাপাতায় সাত ভাগে বা এগারো ভাগে রাখতে হয়। তাতে উপর থেকে অল্প অল্প করে দুধ ঢেলে দিয়ে একটু করে শক্ত নতুন গুড় দিতে হয়। এবার সাত বা এগারো নম্বর পিঠে দুইভাগ করে দুই বোন উমনো ও ঝুমনোর নামে দুই ঘটের মধ্যে দিতে হয়।

পুজো সম্পূর্ন হলে সন্ধ্যায় ইতু বিসর্জন হয়। ইতু সরাকে পূজারিণী মাথায় নিয়ে বাড়ির নিকটবর্তী কোনো জলাশয়, নদী বা পুষ্করিণীতে অবগাহন করে বাম দিকের ঘটটি সরা সমেত বিসর্জন দিয়ে দক্ষিণ দিকের ঘট নিয়ে ঘরে ফেরেন।

স্বভাবতই শীতের সন্ধ্যে পুকুরের কনকনে ঠান্ডা জলে ডুব দিয়ে ব্রতচারিণী কৃচ্ছ সাধন করেন। এটাই তাঁকে মহিমা দান করে থাকে।

পূর্ববঙ্গে একেই বলে ‘চুঙ্গির ব্রত’ বা “চুঙীর ব্রত ” । চুঙ্গি বা চুঙী অর্থে চোঙ্গ। সেখানে ঘটের পরিবর্তে বাঁশের চোঙ্গ ব্যবহার করা হয়—এইমাত্র পার্থক্য। চুঙীর ব্রতে নলগাছের চোঙার মধ্যে একুশ গাছি দূর্বা ও একুশটি আলোচাল ভরে তা দুধে স্নান করিয়ে সূর্যকে নিবেদন করা হয়। শোনা হয় ব্রতকথা।

মানভূম অঞ্চলে ‘ইবতি’-র প্রতিষ্ঠা হয় মাটির হাঁড়ি চকখড়িতে অনুরঞ্জিত করে এবং তাতে নানান গাছগাছালি দিয়ে।

সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গ ও রাঢ় অঞ্চল জুড়ে এই পূজা হয়। কোথাও কম কোথাও বেশি। লোকসংস্কৃতির গবেষকগনের মধ্যে অনেকে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলায় ব্যাপক হারে প্রচলিত টুসু বা তুষ তুষালী ব্রত বা টুসু লক্ষ্মীর পূজা ও ব্রতকে ইতু পূজার একটি বিবর্তিত রূপ বলে মনে করেন।টুসু বা তুষ তুষালী ব্রতের আদিম রূপ তুষ ও গোবরের তাল মাটির সরার উপর রেখে পূজা। পরে টুসুকে অনেকে ঘরের কন্যার রূপ দিয়েছেন। কিন্তু তা ব্যতিক্রম মাত্র।

ক্রমশ

দুর্গেশনন্দিনী

তথ্য : ১. লোকায়ত হাওড়া

২. বাংলার মুখ

৩. হাওড়া জেলার লোক উৎসব

৪. মেয়েদের ব্রতকথা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.