যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্ববিখ্যাত ফুটবলার লিয়োনেল মেসির অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক কেলেঙ্কারির জল এবার গড়াল শতকোটি টাকার আইনি লড়াইয়ে। রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে। এবার তাঁর বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও মানহানির মামলা করার ঘোষণা করলেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংগঠক শতদ্রু দত্ত। আগামী ৩ জুন এই দেওয়ানি মামলাটি দায়ের করা হবে।
বিবাদীদের তালিকায় জুঁই বিশ্বাস ও সাংবাদিকেরা
সোমবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে শতদ্রু দত্ত জানান, এই প্রস্তাবিত মামলায় মূল অভিযুক্ত অরূপ বিশ্বাস ছাড়াও বিবাদীদের তালিকায় রয়েছেন জুঁই বিশ্বাস এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। তাঁর দাবি, এই ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের ফলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসায়িক সুনাম এবং অনুষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
শতদ্রু আরও জানান, সংগ্রহে থাকা ভিডিও ফুটেজ, প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র এবং অন্যান্য অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই দায়ের হওয়া এফআইআর-এ নতুন ধারা যুক্ত করার আবেদন জানানো হবে। এর মধ্যে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি (ফৌজদারি ষড়যন্ত্র) ধারার পাশাপাশি প্রতারণা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ফৌজদারি ধারা অন্তর্ভুক্ত করার আর্জি জানানো হচ্ছে।
আইনি পদক্ষেপ নিয়ে সংগঠকের বক্তব্য: “আমরা এখনও পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত এমন ১৯ জন ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করেছি, যাঁদের ভূমিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই ঘটনার কারণে আয়োজক, অংশীদার এবং হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী যে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তার জন্য প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।”
পাশাপাশি, বাটা ক্লাবের প্রতিনিধি অভিজিৎ দত্তের বিরুদ্ধেও অনৈতিকভাবে মাঠে প্রবেশ করার অভিযোগ এনেছেন শতদ্রু দত্ত। নিয়মভঙ্গের কারণে তাঁর বিরুদ্ধেও পৃথক আর্থিক ক্ষতিপূরণের মামলা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রীর বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ
পুলিশ সূত্রে খবর, প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির মোট পাঁচটি জামিন অযোগ্য ও গুরুতর ধারায় এফআইআর রুজু করা হয়েছে:
- অভিন্ন উদ্দেশ্য: ধারা ৩(৫)
- তোলাবাজি: ধারা ৩০৮(২)
- প্রতারণা: ধারা ৩১৮(৪)
- অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন: ধারা ৩৫১(২)
- অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র: ধারা ৬১(২)
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির বহুপ্রতীক্ষিত মেগা ইভেন্টের আগে শতদ্রু দত্তের কাছে বিপুল পরিমাণ টিকিট দাবি করেন তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী। তাঁর নির্দেশ অমান্য করলে অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। চাপের মুখে পড়ে শতদ্রু অরূপ বিশ্বাসকে ২২ হাজার ‘কমপ্লিমেন্টারি’ (বিনামূল্যে) টিকিট দিতে বাধ্য হন, যা পরবর্তীতে চড়া দামে কালোবাজারি করা হয় বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মাঠে ধাক্কাধাক্কি, আক্রান্ত সুয়ারেজ় ও ডি’পল
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের বঞ্চিত করে ভিভিআইপি গ্যালারি ও মাঠ দাপিয়ে বেরিয়েছেন মন্ত্রী, নেতা, ছবিশিকারি এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। এমনকি মাঠের ভেতর লিয়োনেল মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস। প্রভাবশালী ও তাঁদের অনুগামীদের হুড়োহুড়িতে মাঠে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, মেসির সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ়ের পেটে কারও কনুইয়ের গুঁতো লাগে এবং রদ্রিগো ডি’পলের হাত অন্য একজনের নখের ঘায়ে ছড়ে যায়। অগত্যা মেসির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তড়িঘড়ি তাঁকে মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
এর পরেই গ্যালারিতে থাকা ক্রুদ্ধ দর্শকেরা মাঠে ঢুকে ভাঙচুর ও তাণ্ডব শুরু করেন। এই ঘটনার জেরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ‘অব্যাহতি’ নিতে বাধ্য হন অরূপ বিশ্বাস।
১৯ কোটির টিকিট বিক্রি ও পুলিশি মামলা
এর আগে গত ১৯ মে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অরূপ বিশ্বাস, জুঁই বিশ্বাস, আইএএস (IAS) আধিকারিক শান্তনু বসু এবং রাজ্য পুলিশের তত্কালীন ডিজি রাজীব কুমার-সহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন শতদ্রু। তাঁর স্পষ্ট দাবি, প্রভাবশালীদের এই অপেশাদার আচরণের জন্যই পুরো অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়েছে।
উল্লেখ্য, যুবভারতীর ওই ঘটনায় বিধাননগর দক্ষিণ থানায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। প্রথম মামলায় একমাত্র শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যিনি বর্তমানে জামিনে মুক্ত। দ্বিতীয় মামলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালতে শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মেসিকে দেখার জন্য প্রায় ৩৫ হাজার দর্শক টিকিট কেটেছিলেন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৯ কোটি টাকা। এত বড় মাপের একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্টে এই ধরনের নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ও বিশৃঙ্খলা খতিয়ে দেখতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

