পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহে যেকোনো গবেষকের ঈর্ষার কারণ হতে পারেন ক্লাসিক অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী

গল্পটা বসন্তের। বলা ভালো, এক অন্যরকম বসন্তের। এ বসন্তে কোকিলের কুহুতান ম্লান হয়ে এলেও, তার রূপ মাধুর্য ফিকে হয়না একরত্তিও। তারিখটা ৫ মে, অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর জন্মদিন। ১৯২৮ সালে আজকের দিনেই নাগপুরে, অভিজাত-সম্পন্ন দত্ত চৌধুরী পরিবারে জন্ম হয়েছিল তাঁর। প্রখর গ্রীষ্মে জন্ম হয়েও তিনি বাংলা ছবির ঋতুরাজ, বসন্ত চৌধুরী (Basanta Chowdhury)। আদতে প্রবাসী বাঙালি। সিদ্ধিশচন্দ্র চৌধুরী এবং কমলা চৌধুরীর বড় ছেলে। ভালোবাসতেন ক্রিকেট খেলতে।

তিনি ছিলেন গনেশ মূর্তির সংগ্রাহক। তাঁর ভাণ্ডারে অসংখ্য দুর্লভ গণেশের মূর্তি ছিল। মূর্তি সংগ্রহে ছুটে বেড়িয়েছেন সমগ্র ভারতবর্ষ, চট্টগ্রাম, মায়ানমার , নেপাল এমনকি নিউ ইয়র্ক ।

মাত্র তেরো বছর বয়সে বাবা সিদ্ধিশচন্দ্র চৌধুরীকে হারান বসন্ত চৌধুরী। নিজের জীবন-জীবিকা নিয়ে তাগিদ শুরু সেই বয়স থেকেই। পড়াশোনা এবং খেলাধুলার পাশাপাশি ছোটোবেলা থেকে অভিনয়ের প্রতিও অগাধ টান ছিল তাঁর। নাটকও করেছেন বেশ কয়েকবার। পিতৃবিয়োগের পর থেকেই ভবিষ্যৎ জীবন কেমন হবে, তা সম্পর্কে ভাসা ভাসা কিছু স্বাধীন ভাবনা ভিড় করত মনে। অভিনয়ের তাগিদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে বসলো তখন থেকে।

সময়টা ১৯৫০। বসন্ত চৌধুরীর বয়স তখন ২২। নাগপুরের (Nagpur) দীননাথ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক শেষ করে আগের বছরই সেখানকার মরিস কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন। এরপর কিছুটা ইচ্ছের উপর ভর করে একদিন চড়ে বসলেন বম্বে মেল-এর কামরায়। গন্তব্য কলকাতা

কলকাতার অদূরে আন্দুল গ্রামশহরেই ছিল তাঁদের দত্ত চৌধুরী জমিদার বংশের ভিটেবাড়ি, একডাকে গোটা বাংলা তখন চেনে তাদের পরিবারকে। অথচ সেই সূত্র কোনোদিনই ব্যবহার করতে শোনা যায়নি বসন্ত চৌধুরীকে। স্বপ্ন সত্যি করার বাস্তব পথটা একার জোরেই চিনতে চেয়েছিলেন তিনি। রোম্যান্টিক নায়কের (Romantic Hero) ব্যাটন নিঃশব্দে চলে এসেছিল তাঁর হাতে। এমনকি তাতে বিন্দুমাত্রও ম্লান হয়নি পূর্বজর আভিজাত্য এবং গরিমা।

একটা সময় এমনও গেছে যখন কাজের আশায় সারাদিন বসন্ত ঘুরতেন কলকাতার (Kolkata) স্টুডিও পাড়ায় এবং খেতেন কোনো পাইস হোটেলে। কলকাতায় এক বন্ধু রবি দে, যিনি বৌবাজারে একটি ল্যাবরেটরিতে চাকরি করতেন তিনি বসন্ত চৌধুরীকে সেই ল্যাবরেটরির অফিসঘরে রাতে শোবার বন্দোবস্তো করে দিয়েছিলেন। কথাতেই আছে, “প্যাহেলে দর্শনধারী, পিছে গুণ বিচারি”, আর সেখানে বসন্ত চৌধুরী তো রুপে, গুণে দু’য়েতেই অসাধারণ। একে অত্যন্ত সুপুরুষ দেখতে তার ওপর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, চিত্র নির্মাতাদের চোখে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি তাঁর।

‘রাধা ফিল্মস’-এর (Radha Films) ‘মন্দির’ ছবিতে নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সবেমাত্র সই করেছেন বসন্ত চৌধুরী। ঠিক ওই সময়েই ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর (New Theatre) নতুন ছবি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’র (Mahaprasthaner Pothe) নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের অফার আসে তাঁর কাছে, নায়িকা ছিলেন অরুন্ধতী দেবী। একদিকে এতদিনের স্বপ্ন, ঐতিহ্যশালী নিউ থিয়েটার্সের অভিনেতা হিসেবে যোগ দেওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে ‘রাধা ফিল্মস’-এর চুক্তির শর্ত! অথৈ জলে পড়লেন অভিনেতা। অবশেষে দেবকীকুমার বসুর মধ্যস্থতায় এই জটিল টানাপোড়েন থেকে নিষ্কৃতি পান। এভাবেই অদ্ভুত জটিলতার মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় তাঁর অভিনয় জীবনের। তাই বি.এন সরকারের ‘নিউ থিয়েটার্স’কেই অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর জন্মদাতা বলা যেতে পারে। ১৯৫২ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় বসন্ত চৌধুরী ও অরুন্ধতী দেবী অভিনীত দ্বিভাষিক ছবি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ (হিন্দিতে যার নাম ছিল ‘যাত্রিক’)। প্রথম ছবিতেই সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেন অভিনেতা।

তারপর একে একে ‘ভগবান শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘যদুভট্ট’, ‘আঁধারে আলো’, ‘অনুষ্টুপ ছন্দ’, ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, ‘শঙ্খ বেলা’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ এবং অবশ্যই ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নায়কোচিত অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর অনায়াস চলাচল ছিল খলনায়কের ভূমিকাতেও। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ ছবিতে সেরকমই একটি নেগেটিভ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন বসন্ত চৌধুরী। এরই পাশাপাশি আবার পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের (Rituparno Ghosh) প্রথম ছবি ‘হীরের আংটি’-তে (Hirer Angti) তাঁর কাজ, সব মিলিয়ে যেন ক্লাসিক অভিনয়ের প্রতিভূ ছিলেন বসন্ত চৌধুরী। বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বলিউডেও তাঁর অভিনয়ের খ্যাতি সমুজ্জ্বল। ‘যাত্রিক’, ‘নয়া সফর’, ‘পরখ’, ‘রাহগীর’, ‘এক ডক্টর কি মউত’ –এর  মতো  ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও সিনেপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। 

‘একই অঙ্গে এতো রূপ’, এটাই শ্রদ্ধেয় অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর এককথায় পরিচয়। তিনি ছিলেন সুরা, সিগার এবং পঞ্চব্যঞ্জন বিলাসী। বন্ধুমহলে ছিলেন আড্ডার মধ্যমণি। আদ্যোপান্ত বনেদিয়ানার প্রতিভূ বসন্ত চৌধুরী কেবলমাত্র একজন প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন তাই নয়, অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর আর এক বিশেষ সত্ত্বা অবশ্যই পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহ। তিনি ছিলেন একজন প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ (Archaeologist)। বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন প্রত্নতত্ত্ব সংক্রান্ত নানান গবেষণাধর্মী লেখা। পশমিনা-সহ কাশ্মীরি বা পার্সিয়ান শাল থেকে শুরু করে প্রাচীন মুদ্রা ! তাঁর সংগ্রহ যে কোনও গবেষকের কাছে ঈর্ষণীয়। জানা যায়, স্বয়ং সত্যজিৎ রায় (satyajit Roy) তাঁর সংগ্রহ থেকে শাল ব্যবহার করেছিলেন নিজের ছবিতে। এছাড়াও তিনি ছিলেন গনেশ মূর্তির সংগ্রাহক। তাঁর ভাণ্ডারে অসংখ্য দুর্লভ গণেশের মূর্তি ছিল। মূর্তি সংগ্রহে ছুটে বেড়িয়েছেন সমগ্র ভারতবর্ষ, চট্টগ্রাম (Chittagong), মায়ানমার (Myanmar), নেপাল (Nepal) এমনকি নিউ ইয়র্ক (New York)। শৈশবে দেখা দশ দিনের ‘গণেশ উৎসব’ থেকেই তাঁর এই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বলে নিজেই জানিয়েছিলেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। মৃত্যুর কিছু দিন আগে বসন্ত চৌধুরী তাঁর বহুমূল্য শ’খানেক গণেশমূর্তির সংগ্রহ ভারতীয় জাদুঘরে (Indian Museum) দান করে যান, যা বিক্রি করলে নিঃসন্দেহে তিনি কোটি কোটি টাকা পেতে পারতেন। 

অভিনয়-পরবর্তী জীবনে বসন্ত চৌধুরীকে দেখা গেছে নন্দন-এর (Nandan) চেয়ারম্যান রূপে। আবার অভিনয় বৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে কলকাতার শেরিফ (Sheriff of Calcutta) হিসেবেও তিনি সমুজ্জ্বল। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন যে খুব একটা সুখকর ছিল না, সেকথা অবশ্য অনেকেই জানেন। ছোটোবেলায় পিতৃবিয়োগ, এমনকি সাংসারিক জীবনেও ছিল চরম অশান্তি। অথচ বহু দুঃখেও কখনও জীবনবিমুখ হননি পর্দার হিরো। কলকাত্তাইয়া বনেদি কৃষ্টির যে পরিমার্জিত ছাপটি তিনি পোশাক পরিচ্ছদ ও বাচনরীতিতে সারাজীবন সযত্নে লালন করেছিলেন, মৃত্যুতেও তাঁর অন্যথা হতে দেননি। ২০ জুন, ২০০০ সালে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর রানিকুঠির বাড়িতে মারা যান তিনি। লিখে রেখে যান ইচ্ছাপত্র। সেই ইচ্ছাপত্রের নির্দেশ মেনে তাঁর দুই ছেলে সকলের অজ্ঞাতসারে তাঁর সৎকার করেন। প্রথা মাফিক পারলৌকিক কাজও করতে তিনিই নিষেধ করে গিয়েছিলেন। তাঁর এই নিঃশব্দে চলে যেতে চাওয়া যেন বাঙালিকে আবার মনে করিয়ে দেয় তাঁর ছবিতে গাওয়া হেমন্তের সেই বিখ্যাত গানের কলি “তুমি আছো, আমি আছি তাই/ অনুভবে তোমারে যে পাই”। সত্যিই তাই, বসন্ত চৌধুরী যেন এভাবেই বাঙালির অনুভবে মিশে থেকে গেলেন।

©কঙ্কনা মুখার্জী

বঙ্গদর্শন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.