বর্ষা প্রবেশের দিনক্ষণ আবার পিছিয়ে গেল দেশে! কবে শেষ পর্যন্ত কেরলে আসবে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু

বর্ষা প্রবেশের দিনক্ষণ আবার পিছিয়ে গেল দেশে! কবে শেষ পর্যন্ত কেরলে আসবে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু

খাতায়-কলমে ১ জুন, সোমবারই ভারতের মূল ভূখণ্ডে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু তথা বর্ষা প্রবেশ করার নির্ধারিত দিন। তবে কেরল উপকূলের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভারতীয় মৌসম ভবন (IMD) জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে দেশে বর্ষার আগমনের কোনও সম্ভাবনা নেই। আবহবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৩ জুনের আগে দেশে বর্ষা প্রবেশ করছে না, এমনকি এই প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চলতি বছরে এই নিয়ে মোট তিন বার দেশে বর্ষার আগমনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ পিছিয়ে দিল মৌসম ভবন। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, এবার সময়ের বেশ কিছুটা আগে অর্থাৎ ২৬ মে কেরলে বর্ষা ঢুকবে। পরবর্তীতে সেই তারিখ পিছিয়ে ২৮ মে করা হয়। এরপর আশা করা হয়েছিল যে অন্তত নির্ধারিত দিন ১ জুনেই বর্ষার আগমন ঘটবে। তবে শেষ পর্যন্ত তা-ও সম্ভব হলো না।

বর্ষার আগমনে বিলম্বের কারণ কী?

সাধারণত কেরল হয়েই ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে মৌসুমি বায়ু এবং তা ধীরে ধীরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে জুন মাসের শেষ বা জুলাইয়ের শুরুতে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মৌসম ভবনের নিয়ম অনুযায়ী, দেশে বর্ষা প্রবেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: ১. কেরলের আবহাওয়া কেন্দ্রগুলির অন্তত ৬০ শতাংশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হতে হবে। ২. আরব সাগরের ওপর পশ্চিমা বায়ুর গতিবেগ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি থাকতে হবে। ৩. উপগ্রহ চিত্রে আকাশে পর্যাপ্ত মেঘপুঞ্জের উপস্থিতি নিশ্চিত হতে হবে।

আবহবিদদের মতে, বর্তমানে কেরল উপকূলে পশ্চিমা বায়ু অত্যন্ত দুর্বল। কেরল ও লক্ষদ্বীপের বাতাসে জলীয় বাষ্প রয়েছে এবং বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিও হচ্ছে, কিন্তু তাকে কোনওভাবেই বর্ষার আগমন বলা চলে না। মৌসম ভবন জানিয়েছে, এই মুহূর্তে বঙ্গোপসাগরের ওপর একটি ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে, যা বর্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। এই ঘূর্ণাবর্তটি মৌসুমি বায়ুকে মূল ভূখণ্ডের দিকে ঠেলে পাঠানোর গতিকে বিক্ষিপ্ত ও দুর্বল করে দিয়েছে। ১ জুন থেকে এই বাতাস ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে শুরু করলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে বর্ষার আগমনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

বিলম্বিত বর্ষা ও ‘এল নিনো’র জোড়া ফলায় উদ্বেগের আশঙ্কা

মৌসম ভবন স্পষ্ট করেছে যে, নির্ধারিত দিনের চেয়ে দু-চার দিন দেরি হলে তাকে বিলম্বিত বর্ষা বলা যায় না। সরকারি নিয়ম মেনে ১ জুনের পর আরও সাত দিন অর্থাৎ ৮ জুনের মধ্যেও যদি বর্ষা না ঢোকে, তবেই তাকে ‘বিলম্বিত বর্ষা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই হিসেবে এখনই বর্ষা দেরিতে আসছে এমনটা বলা যাবে না।

তবে আবহবিদদের আসল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত ‘এল নিনো’ (El Niño)-র প্রভাবে চলতি জুন মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে বর্ষার বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে। পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিছু অংশেও বর্ষা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। এর ফলে দেশের বেশ কিছু এলাকায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং পানীয় জলের উৎসে টান পড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলায় আগে থেকেই পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও সতর্কবার্তা জারি করেছে মৌসম ভবন। এই আবহে বর্ষা আরও পিছিয়ে গেলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিগত এক দশকের বর্ষা আগমনের খতিয়ান

বিগত বছরগুলিতে ভারতের মূল ভূখণ্ডে (কেরল) বর্ষা প্রবেশের তারিখগুলির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, প্রতি বছরই এই দিনক্ষণে ব্যাপক তারতম্য ঘটেছে:

  • ২০২৪: ৩০ মে (নির্ধারিত সময়ের ১ দিন আগে)
  • ২০২৩: ৮ জুন (বিলম্বিত)
  • ২০২২: ২৯ মে (সময়ের আগে)
  • ২০২১: ৩ জুন
  • ২০২০: ১ জুন (নির্ধারিত সময়ে)
  • ২০১৯: ৮ জুন (বিলম্বিত)
  • ২০১৮: ২৯ মে (সময়ের আগে)
  • ২০১৭: ৩০ মে (সময়ের আগে)
  • ২০১৬: ৮ জুন (বিলম্বিত)
  • ২০১৫: ৫ জুন (বিলম্বিত)

বিগত বছরগুলির এই খতিয়ান স্পষ্ট করছে যে, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে বর্ষার আগমন প্রায়শই ওলটপালট হয়ে যায়। তবে বর্তমান বছরের খরা ও জলসংকটের পূর্বাভাসের কারণে এবার বর্ষার গতিপ্রকৃতির ওপর কড়া নজর রাখছেন আবহবিদেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.