ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নক্ষত্রপতন। রবিবার মুম্বইয়ের লোখন্ডওয়ালার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রবীণ ও কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী সুমন কল্যাণপুর (১৯৩৭-২০২৬)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ষাট এবং সত্তরের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক জগতে যখন সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের একচ্ছত্র আধিপত্য, সেই সময়ে লতার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তুলনা হওয়া সত্ত্বেও নিজের এক স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন সুমন কল্যাণপুর।
লতা-রফি সংঘাত এবং সুমনের উত্থান
বলিউডের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সঙ্গীত জগতের এক বিশেষ মোড়ে সুমন কল্যাণপুরের কর্মজীবন এক অভাবনীয় গতি পেয়েছিল, যার নেপথ্যে ছিল লতা মঙ্গেশকর এবং মহম্মদ রফির মধ্যকার ঐতিহাসিক মতবিরোধ।
সেই সময়ে গানের ‘রয়্যালটি’ বা স্বত্ব নিয়ে লতা ও রফির মধ্যে তীব্র বিরোধ বাধে। লতা মঙ্গেশকর চেয়েছিলেন, প্লেব্যাক করা সমস্ত গায়ক-গায়িকাই যেন তাঁদের গানের রয়্যালটি পান। এই দাবিতে সেই সময়ের প্রথম সারির বহু শিল্পী তৎকালীন এক শীর্ষস্থানীয় মিউজ়িক সংস্থার বিরুদ্ধে সরব হন। কিন্তু মহম্মদ রফি সেই সংস্থার পক্ষে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় লতা ক্ষুব্ধ হন।
২০০৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে লতা নিজেই এই বিরোধের কথা স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, এক বৈঠকে রফি তাঁকে ব্যঙ্গ করে ‘মহারানি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। পাল্টা জবাবে লতা বলেন, “আমি মহারানি হতে পারি, কিন্তু আপনি আমাকে এ ভাবে কেন ডাকছেন?” এই ঘটনা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, রফি ঘোষণা করেন তিনি আর কখনও লতার সঙ্গে গান গাইবেন না। লতাও পাল্টা একই সিদ্ধান্ত নেন।
রফির সঙ্গে কালজয়ী ‘ডুয়েট’
লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফির এই দীর্ঘ দূরত্বের কারণে চলচ্চিত্র পরিচালকেরা এমন এক নারী কণ্ঠের খোঁজ শুরু করেন, যিনি রফির সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠ বা ‘ডুয়েট’ গাইতে পারবেন। কণ্ঠের আশ্চর্য সাদৃশ্যের কারণে সেই সুযোগ চলে আসে সুমন কল্যাণপুরের কাছে। রফির সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি একের পর এক কালজয়ী ও জনপ্রিয় গান উপহার দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে’
- ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’
লতার সঙ্গে তুলনা ও পারস্পরিক বন্ধুত্ব
লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের তুলনাকে সুমন কল্যাণপুর নিজে অবশ্য কোনও দিন বাড়তি গুরুত্ব দেননি বা একে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি। ২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে লতাকে নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু উল্লেখ করে সুমন বলেছিলেন, “সবাই লতার গান ভালবাসত। তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। যখনই ওঁর সঙ্গে দেখা হত, মনে হত খুব কাছের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করছি। আমার বিশ্বাস, ওঁরও একই অনুভূতি ছিল।”
সঙ্গীতের ইতিহাসের এক বিরল মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। মীনা কুমারী অভিনীত ‘চাঁদ’ চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকর এবং সুমন কল্যাণপুর একসঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন ‘কভি আজ কভি কাল’ গানটিতে। প্রবীণ এই শিল্পীর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীত ঘরানার একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

