মেসি বনাম ইয়ামাল, স্কালোনি বনাম ফুয়েন্তে: হাইভোল্টেজ মেগা ফাইনালে কোন কৌশলে কাকে টেক্কা দিচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা?

মেসি বনাম ইয়ামাল, স্কালোনি বনাম ফুয়েন্তে: হাইভোল্টেজ মেগা ফাইনালে কোন কৌশলে কাকে টেক্কা দিচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা?

ফুটবল বিশ্বকাপের এর চেয়ে সেরা ফাইনাল হয়তো আর হতে পারত না। একদিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল, যেখানে প্রতিভার আলো ছড়াচ্ছেন ১৯ বছরের তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, যিনি একার কাঁধে দলকে পর পর দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার মহাকাব্যিক লড়াইয়ে নেমেছেন। মাঠের রণকৌশলে কোন দল কোথায় একে অপরকে টেক্কা দিচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলে দুই শিবিরেরই বেশ কিছু শক্তি ও দুর্বলতা চোখে পড়ে।

পরিসংখ্যানের দিক থেকে স্পেনের এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল হলেও, আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এটি সপ্তম। একমাত্র জার্মানি (৮) তাদের চেয়ে বেশি ফাইনাল খেলেছে। তবে এবারের লড়াইটি শুধু ফুটবলারদের নয়, মাঠের বাইরে দুই ‘গুরু-শিষ্য’ অর্থাৎ স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির ট্যাকটিকাল মগজাস্ত্রেরও।

পাসিং ও বিল্ড-আপে অপ্রতিরোধ্য স্পেন

চলতি বিশ্বকাপে কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র ছাড়া স্পেনের পারফরম্যান্স এককথায় নিখুঁত। স্প্যানিশ মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি তাদের অধিনায়ক রদ্রি, যিনি এই বিশ্বকাপে রেকর্ড ৬৫৫টি সঠিক পাস দিয়েছেন— যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক। রদ্রিকে যোগ্য সংগত দিচ্ছেন ১৯ বছরের ডিফেন্ডার পাও কুবারসি। তিনি ৫৫০টি সঠিক পাস দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি ম্যাচে গড়ে ২২টি ডিফেন্সচেরা পাস বাড়িয়েছেন, যার ৯৪ শতাংশই নিখুঁত।

স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের পাসিং রেশিও ও গতির নিয়ন্ত্রণ। প্রতি ম্যাচে গড়ে ২৮ বার নয় বা তার বেশি পাসের একটানা মেলবন্ধন তৈরি করেছে তারা, যা অনন্য। গোলরক্ষক উনাই সিমন থেকে শুরু করে মাঠের প্রতিটি প্রান্ত ব্যবহার করে আক্রমণ বুনছে স্পেন। দুই সাইড ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া (বাঁ-প্রান্তে আলেক্স বায়েনার সাথে) এবং পেদ্রো পোরো (ডান প্রান্তে ইয়ামালের সাথে) আক্রমণ ও রক্ষণে ক্রমাগত ওঠানামা করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছেন। টুর্নামেন্টে স্পেনের আক্রমণের ৩১ শতাংশই শেষ হয়েছে প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে।

আর্জেন্টিনার রক্ষণ বনাম স্পেনের আক্রমণ

আর্জেন্টিনার জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে তাদের উইং বা দুই প্রান্তের রক্ষণ। চলতি বিশ্বকাপে আলবিসেলেস্তেরা যে সাতটি গোল খেয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটিই এসেছে প্রান্ত ধরে। নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো ও নাহুয়েল মোলিনা আক্রমণে যতটা স্বচ্ছন্দ, রক্ষণে ততটা জমাট নন। ফলে দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ় ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ফাইনালে স্কালোনি যদি এই উইং-এর সমস্যা মেটাতে না পারেন, তবে ইয়ামাল ও কুকুরিয়ারা সেই পথ ধরেই মেসির দলের বিপদ বাড়াতে পারেন।

মাঝমাঠের দখল ও ‘মেসি ম্যাজিক’

আর্জেন্টিনার প্রধান শক্তি তাদের মাঝমাঠের রসায়ন। এঞ্জো ফের্নান্দেজ়, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ইউলিয়ান আলভারেজ় ও রদ্রিগো ডি পলের পাসিংয়ে তৈরি হওয়া আক্রমণের কেন্দ্রে রয়েছেন লিওনেল মেসি। এই চার মিডফিল্ডারের কল্যাণে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল থার্ডে আর্জেন্টিনা ৩৩ শতাংশ বলের দখল রাখতে পেরেছে, যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ।

প্রতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা গড়ে ৪০টি ডিফেন্সচেরা থ্রু পাস বাড়িয়েছেন, যার নেপথ্য কারিগর মেসি। চলতি বিশ্বকাপে মাঠে ৬৪ শতাংশ সময় তিনি হেঁটে অতিবাহিত করলেও, বল পায়ে পেলেই রুদ্ররূপ ধারণ করছেন। আর্জেন্টিনার তৈরি করা মোট গোলের সুযোগের ৫৫ শতাংশই এসেছে মেসির পা থেকে।

সাইড বেঞ্চ ও লাউতারো ফ্যাক্টর

আর্জেন্টিনার আরও একটি বড় শক্তি হলো তাদের শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চ। নিকো গঞ্জালেজ় বা লাউতারো মার্তিনেজ়রা বারবার দলের জয়ে ভূমিকা রাখছেন। বিশেষ করে লাউতারো মার্তিনেজ় মাঠে নামার পর মেসির খেলার ধরন বদলে যায়। লাউতারোর উপস্থিতিতে মেসি মাঝমাঠ ছেড়ে ডান প্রান্তে সরে যাওয়ার জন্য অনেকটা ফাঁকা জায়গা পান। সেখান থেকে উইং কেটে ভেতরে ঢুকে শট মারা কিংবা উইং দিয়ে ক্রস তোলার ক্ষেত্রে মেসিকে আটকানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই অসম্ভব।

সব মিলিয়ে, ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষই অত্যন্ত ট্যাকটিকাল ও ছকবাঁধা ফুটবল খেলে। তবে হাইভোল্টেজ ম্যাচে যখন দুই দলের রণকৌশল একে অপরকে ব্লক করে দেবে, তখন পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ব্যক্তিগত দক্ষতা বা একক জাদুকরী মুহূর্ত। একদিকে মেসির অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা, অন্যদিকে ইয়ামালের গতি ও তারুণ্য— রবিবাসরীয় মেগা ফাইনালে তাই খেতাবের দাঁড়িপাল্লায় কাউকে এগিয়ে রাখা কঠিন। এক চরম দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা ফুটবলবিশ্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.