সার্ভিস কোটায় এসএসকেএম হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে অভীক দে-র ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন মোড়। অভীক তো বটেই, তাঁকে অন্যায়ভাবে সার্ভিস কোটা পাইয়ে দিতে সাহায্যকারী স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। সম্প্রতি রাজ্য সরকারের গঠিত দ্বিতীয় পর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রথম কমিটির রিপোর্টকে সমর্থন ও তদন্ত কমিটির গঠন
আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে ‘থ্রেট কালচার’-এর অভিযোগ তুলে অভীক দে এবং বিরুপাক্ষ বিশ্বাসদের বিরুদ্ধে জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। সেই সময় এনআরএসের প্রাক্তন অধ্যক্ষ পীতবরণ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটি ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর স্বাস্থ্য ভবনে রিপোর্ট জমা দিয়ে অভীকের সার্ভিস কোটাকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করেছিল।
এরপর রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর গঠিত হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের চার সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি। সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধানের নেতৃত্বাধীন এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন আরজি করের অধ্যক্ষ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, এসএসকেএমের ফরেনসিক মেডিসিনের চিকিৎসক সোমনাথ দাস এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর কৌশিক মিত্র। গত ২ সেপ্টেম্বর জমা পড়া এই রিপোর্টেও পূর্বের কমিটির সিদ্ধান্তকেই সম্পূর্ণ মান্যতা দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে মিলেছিল সার্ভিস কোটা? অনিয়মের চিত্র
তদন্তে উঠে এসেছে যে, সার্ভিস কোটায় স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির জন্য গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় তিন বছর কাজ করার নিয়ম থাকলেও, অভীক প্রভাব খাটিয়ে তা এড়িয়ে গেছেন। এসএসকেএমের সার্জারি বিভাগে ভর্তির জন্য তিনি বর্ধমানের অনাময় হাসপাতালকে গ্রামীণ হাসপাতাল এবং কোভিডকালকে দুর্গম পরিস্থিতি হিসেবে দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু চিকিৎসক সংগঠন ও তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে:
- পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত হলেও অনাময় হাসপাতাল প্রথাগত গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আওতাভুক্ত নয়।
- অনাময়ের রেডিয়ো-ডায়াগনোসিস বিভাগের আরএমও হিসেবে অভীকের কাজ করার কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ বা নথি মিলিয়েইনি।
- হাসপাতালের সুপার শকুন্তলা সরকারসহ অন্য কর্মীরাও নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁরা অভীককে সেখানে কখনো ডিউটি করতে দেখেননি।
এর পরেও অনাময়ে তাঁর কাজের ভুয়ো প্রমাণ দেখাতে স্বাস্থ্য ভবনে একটি ফাইল তৈরি করা হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিশেষ সচিব ও ডিএমই দেবাশিস ভট্টাচার্যের নির্দেশে তনুশ্রী মণ্ডল নামের এক চিকিৎসক ওই ফাইল তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি বদলির নির্দেশিকা জারির আগেই অভীকের কাজে যোগদানের দাবি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিটি।
ভিজিল্যান্সের অনুমোদনহীনতা ও আধিকারিকদের ভূমিকা
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে আরও দুটি গুরুতর অনিয়ম সামনে এসেছে। প্রথমত, সার্ভিস কোটার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ট্রেনি রিজার্ভ অর্ডার’ বা স্বাস্থ্য দফতরের অনুমোদনের ক্ষেত্রে ভিজিল্যান্স সেলের কোনো সবুজ সঙ্কেত বা অনুমোদন ছিল না। তা সত্ত্বেও তৎকালীন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা অনিরুদ্ধ নিয়োগীর দেওয়া ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’-এর ভিত্তিতে ফাইল এগিয়েছিল।
কমিটির মতে, স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের প্রত্যক্ষ মদত ও যোগসাজশ ছাড়া অভীকের পক্ষে এভাবে সার্ভিস কোটার সুবিধা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন স্বাস্থ্যকর্তা ও অধ্যক্ষদের অনেকেই সদুত্তর দিতে পারেননি।
রাজনৈতিক ও চিকিৎসকমহলের প্রতিক্রিয়া
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী এই প্রসঙ্গে বলেন, “চিকিৎসকদের আন্দোলনের জেরে ২০২৪ সালে তদন্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি পূর্বে হাই কোর্টে জানানো হয়েছিল অভীকের নিয়োগে অসঙ্গতি নেই। নতুন সরকার আসার পর গঠিত কমিটির রিপোর্টে দোষীদের নাম উঠে এলেও তিন বছর আগের ঘটনায় কবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।”
অন্যদিকে, রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সংক্রান্ত ফাইল এখনও আমার কাছে এসে পৌঁছোয়নি। রিপোর্ট দেখার পরই এ বিষয়ে যা বলার বলব।”

