ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে দেশের নির্বাচন কমিশনে চলা অভ্যন্তরীণ মতানৈক্যের জল্পনা কাটাতে উদ্যোগী হলেন শীর্ষ কর্তারা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশীর মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর, শনিবার প্রথমবার একসঙ্গে বৈঠকে বসলেন তিন নির্বাচন কমিশনার। বৈঠক শেষে কমিশনের তরফে একটি যৌথ প্রেস বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনারদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।
সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন বাকি দুই কমিশনার। এমনকি এসআইআর প্রক্রিয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি পোর্টাল ‘ইসিআইনেট’ পরিচালনা নিয়ে দিল্লি থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং বিরোধীদের পাশাপাশি এনডিএর শরিক দলগুলির একাংশ থেকেও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়।
শনিবারের প্রেস বিবৃতিতে এই সমস্ত জল্পনার জল ঢেলে কমিশন দাবি করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সমস্ত বিজ্ঞপ্তি সর্বসম্মতিক্রমে ও নিয়ম মেনে জারি করা হয়েছে। এমনকি চলতি বছরের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টও এই বিজ্ঞপ্তিকে বৈধ বলে রায় দিয়েছে। পাশাপাশি, দুই কমিশনারের আপত্তির প্রেক্ষিতে বেশ কিছু সংশোধনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে:
- ইআরও-র ক্ষমতা পুনর্বহাল: এসআইআর চলাকালীন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া বা নতুন নাম তোলার ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ইআরও) যে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছিল, তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ইআরও-রাই নথি খতিয়ে দেখে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
- ‘ইসিআইনেট’ পোর্টালের পর্যালোচনা: তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও পোর্টালের অ্যাক্সেস নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার সমাধানে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে আইআইটি বা আইআইআইটি-র বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
- ফর্ম ৬ ও বিএলও-দের ভূমিকা: ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে নতুন নাম তোলার প্রক্রিয়া এবং গোয়া সহ অন্যান্য রাজ্যে বুথ স্তরের আধিকারিকদের (বিএলও) বাড়ি বাড়ি গিয়ে নথি সংগ্রহের নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছে। দিল্লির মতো রাজ্যে অভিযোগ জমা ও নিষ্পত্তির সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
ক্যাবিটেনে সচিবকে পাঠানো চিঠি প্রসঙ্গে কমিশনের ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, ওই আপত্তি কমিশন বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কোনো নীতিগত বিষয়ের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং ডেপুটেশনে আসা এক আধিকারিকের নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্তের বিষয়ে ছিল। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির পর সেই আধিকারিকের নির্দেশগুলি কার্যকরও করা হয়নি।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, কমিশনের এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে অভ্যন্তরীণ কিছু প্রশাসনিক ত্রুটি ছিল, যা এখন সংশোধন করার পথ প্রশস্ত হলো। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এসআইআর পর্বে বাদ পড়া বিপুল সংখ্যক ভোটারের ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলির জট কাটতে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

