আমতলায় অভিষেকের দফতর ভাঙায় হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ, ছুটির দিনে জরুরি শুনানিতে স্থিতাবস্থার নির্দেশ

আমতলায় অভিষেকের দফতর ভাঙায় হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ, ছুটির দিনে জরুরি শুনানিতে স্থিতাবস্থার নির্দেশ

ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমতলার দফতর ভাঙার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভবনটি যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থাতেই রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার প্রশাসনের বুলডোজার অভিযানের পর, রবিবার ছুটির দিনেও সেখানে ভাঙাভাঙির কাজ শুরু হলে জরুরি ভিত্তিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল অভিষেকের সংস্থা ‘লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস’। হাইকোর্টের নির্দেশের পর আপাতত ভাঙার কাজ বন্ধ করা হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত বর্তমান সরকারের আমলেই সাংসদ অভিষেকের ওই দফতরটি সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে— এই অভিযোগে শনিবার তা ভাঙার কাজ শুরু করে প্রশাসন। ভবনটির জমি কেনা হয়েছিল ‘লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থার নামে, যার অন্যতম ডিরেক্টর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার ভবনের একাংশ ভাঙার পরই সংস্থার আইনজীবীদের তরফে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির কাছে ইমেল মারফত জরুরি শুনানির আর্জি জানানো হয়। রবিবার দুপুরে বিচারপতি রাজা বসুচৌধুরীর এজলাসে এই মামলার শুনানি হয়।

আদালতের সওয়াল-জবাব

লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডসের পক্ষে সওয়াল: সংস্থার পক্ষে আইনজীবী কিশোর দত্ত আদালতে অভিযোগ করেন, ভবনটি ভাঙার আগে ভবনের মালিককে জেলা পরিষদের শুনানির জন্য কোনও নোটিস দেওয়া হয়নি। যে সংস্থার নামে জমি কেনা হয়েছে, তার এক ডিরেক্টরকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। সুশান্ত মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। আইনজীবী আরও জানান, গত ৮ জুলাই নোটিস পৌঁছানোর পর ১৫ জুলাই শুনানির দিন ধার্য ছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মাত্র ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল, যা যুক্তিসঙ্গত নয়। তাছাড়া, অভিযোগে কী কী ছিল তার প্রতিলিপি কিংবা ভবন ভাঙার ‘অর্ডার কপি’— কোনওটিই মালিকপক্ষকে দেওয়া হয়নি। বেআইনি নির্মাণ হলেও প্রথমে মালিককে তা ভাঙার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল, যা এ ক্ষেত্রে দেওয়া হয়নি এবং এর ফলে সাধারণ মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

রাজ্য ও জেলা পরিষদের পক্ষে সওয়াল: রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) সুরজিৎ নাথ মিত্র আদালতে জানান, হঠাৎ করে শুনানি হওয়ার কারণে সরকারের তরফে নথিপত্র আনার সুযোগ মেলেনি। তবে গত ৩০ জুন নোটিস পাঠিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে কোন আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা জানানো হয়েছিল। এই নির্মাণটির কোনও বৈধ অনুমোদন ছিল না, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।

অন্য দিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের আইনজীবী তাপস মণ্ডল জানান, জেলা পরিষদের এগ্জ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের পরিদর্শন রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্ল্যানে যে উচ্চতার অনুমোদন ছিল, ভবনটির উচ্চতা তার চেয়ে ৬.৫ মিটার বেশি। এই অতিরিক্ত নির্মাণের জন্য জেলা পরিষদের কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। গত ২৫ জুনের সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই হিয়ারিং অফিসার ভবনটি ভাঙার নির্দেশ দেন। সরকারের দাবি, এই নোটিস ও নির্দেশের বিষয়ে মালিকপক্ষ সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি রাজা বসুচৌধুরী প্রশ্ন তোলেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের নোটিসের বিষয়ে জমির মালিক কি আদেও জানতেন? মামলাটি রেগুলার বেঞ্চে না ওঠা পর্যন্ত প্রশাসনের থেমে থাকা উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত আদালত মামলার পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ওই ভবনে নতুন করে কোনও ভাঙাভাঙি বা কাজ না করার নির্দেশ দিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেয়।

পুলিশি ‘লুটপাটের’ অভিযোগ ও আদালতের অবস্থান

তৃণমূলের পক্ষে আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগ করেন, শনিবার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভবনটি ঘেরাও করার পর সেখান থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ৩০টি ল্যান্ডলাইন ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পুলিশ নিয়ে গিয়েছে এবং সেখানে ‘লুটপাট’ চালানো হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিযোগ করেন, এই অভিযানে বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববিকে ‘সাক্ষী’ হিসেবে রাখা হয়েছিল (যিনি ২০১৪ ও ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে অভিষেকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন)। ববি নিজেও সংবাদমাধ্যমের কাছে ফাইল ও ল্যাপটপ বের করে আনার কথা স্বীকার করেন।

তৃণমূলের আইনজীবী ওই সমস্ত জিনিসপত্র অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার আবেদন জানালেও হাইকোর্ট তা নাকচ করে দেয়। বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পুলিশ ইতিপূর্বে যে পদক্ষেপ করেছে, আপাতত আদালত তাতে কোনও হস্তক্ষেপ করবে না।

নেপথ্যের ঘটনা ও প্রশাসনের দাবি

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মতিউর রহমান মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার নামে জমিটি কেনা হয়েছিল। সুশান্ত মণ্ডলের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়ম মেনেই সুশান্ত, মতিউর এবং লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডসের অন্যতম ডিরেক্টর তথা অভিষেকের বাবা অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৩০ জুন ও ৭ জুলাই নোটিস পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ১৫ জুলাইয়ের শুনানিতে তৃণমূল বা সংস্থার পক্ষে কেউ হাজির হননি।

ফলস্বরূপ, শনিবার সকালে বিডিও, বিএলআরও, দমকল ও বুলডোজার নিয়ে পুলিশ অভিযান শুরু করে। প্রথমে ভবনের সামনের বিলাসবহুল আসবাব ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র সম্বলিত অস্থায়ী শেডটি ভাঙা হয়। পরে মূল ভবনের তালা ভাঙা হলে কিছু স্থানীয় বাসিন্দা ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায়, যাদের পরবর্তীতে পুলিশ সরিয়ে দেয়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবশ্য দাবি, সমস্ত নিয়ম ও বৈধ নকশা মেনেই বাড়িটি তৈরি হয়েছিল এবং প্রশাসনের ডাকা শুনানিতে তাঁর দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে অভিযোগের প্রতিলিপি চেয়েছিলেন, যা প্রশাসন দিতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, মাত্র দু’দিনের মধ্যে বুলডোজার দিয়ে ভবনের একতলা ও দোতলা প্রায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

রবিবার ছুটির দিনে বেলা ১২টায় প্রথম দফার শুনানিতে রাজ্যের কোনও আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে দেড়টায় পুনরায় এজলাস বসলে দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শেষে হাইকোর্ট এই স্থিতাবস্থার নির্দেশ দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.