৪০ সেকেন্ড জিভ বার করে রাখলেই কমবে মানসিক চাপ? নিউ ইয়র্কের চিকিৎসকের আজব দাবিতে দ্বিমত বিশেষজ্ঞদের

৪০ সেকেন্ড জিভ বার করে রাখলেই কমবে মানসিক চাপ? নিউ ইয়র্কের চিকিৎসকের আজব দাবিতে দ্বিমত বিশেষজ্ঞদের

ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা, বিপাক ক্রিয়ায় সাহায্য করা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বশে রাখা—মানবদেহে কর্টিসল নামক হরমোনের ভূমিকা অপরিসীম। চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি ‘স্ট্রেস হরমোন’ বা মানসিক চাপের হরমোন নামেও পরিচিত। শরীরে এই হরমোনের মাত্রা বাড়লে যেমন মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়, তেমনই উল্টোদিকে মানসিক চাপ বাড়লেও কর্টিসলের ক্ষরণ বেড়ে যায়।

সম্প্রতি এই কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক অভিনব ও অদ্ভুত দাওয়াই দিয়েছেন নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের স্নায়ুরোগ চিকিৎসক ড্যান জিনাডের। তাঁর দাবি, কেউ যদি নিয়ম করে দিনে ৪০ সেকেন্ড জিভ বার করে রাখেন, তবে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা কমবে এবং বশে থাকবে মানসিক চাপ। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তি হাস্যকর মনে হলেও, তাঁর এক রোগীর ক্ষেত্রে এই পন্থা অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই চিকিৎসক। তাঁর মতে, এই ভঙ্গিমায় মুখের পেশির এক ধরনের ব্যায়াম হয়, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

ভারতীয় চিকিৎসকদের ভিন্ন সুর ও পরোক্ষ প্রভাবের তত্ত্ব

নিউ ইয়র্কের চিকিৎসকের এই অদ্ভুত দাবিকে অবশ্য পুরোপুরি মান্যতা দিচ্ছেন না ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। কলকাতার চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী এবং বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালের স্নায়ুরোগ চিকিৎসক লোকেশ বি স্পষ্ট জানিয়েছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে জিভ বার করে রাখলে কর্টিসল কমে—এমন কোনও তত্ত্ব বা প্রক্রিয়ার কথা তাঁদের জানা নেই।

তবে চিকিৎসক লোকেশ একটি পরোক্ষ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জিহ্বা প্রদর্শনের ফলে যদি মুখের পেশি আরাম পায় এবং মুখ ও গলার ব্যায়াম হয়, তবে পরোক্ষভাবে মানসিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। আর মানসিক চাপ কমলে সাময়িকভাবে কর্টিসলের মাত্রাও নামতে পারে।

উল্লেখ্য, চিকিৎসকের এই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি না হলেও, ভারতীয় যোগশাস্ত্রের ‘সিংহাসন’-এর সঙ্গে এর কিছুটা মিল পাওয়া যায়। সিংহাসন আসনে বজ্র্রাসনে বসে জিভ বার করে বিশেষ পদ্ধতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট শব্দ করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যোগাসনে দুশ্চিন্তা কমে এবং মুখ ও গলার পেশির ভালো ব্যায়াম হয়।

কর্টিসল বাড়লে শরীরে কী ক্ষতি হয়?

চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী জানান, কর্টিসলের ক্ষরণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেমন:

  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: কর্টিসল বাড়লে রক্তে ইনসুলিন হরমোন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • স্থূলত্ব: এই হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শরীরে মেদ জমায় এবং স্থূলত্বের মতো সমস্যা ডেকে আনে।
  • ডোপামিন হ্রাস ও অনিদ্রা: কর্টিসলের বাড়বাড়ন্ত শরীরে ‘হ্যাপি হরমোন’ হিসেবে পরিচিত ডোপামিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যা সরাসরি মানুষের ঘুমের ওপর কুপ্রভাব ফেলে।

কর্টিসল বশে রাখার বিজ্ঞানসম্মত উপায়

আজব পন্থার চেয়ে চিকিৎসকেরা কর্টিসলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে মূলত স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামীর মতে, কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে রাখার আসল উপায়গুলি হলো:

  • পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা: খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দৈনিক খাদ্যতালিকায় বাদাম, টাটকা ফল, শাকসবজি, মাছ এবং লেবুজাতীয় ফল রাখা জরুরি।
  • নিয়মিত শারীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়ম করে রোজ হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়াম করলে উদ্বেগ বশে থাকে। এর পাশাপাশি শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম দিতে হবে।
  • যোগাভ্যাস ও মনঃসংযোগ: নিয়মিত প্রাণায়াম এবং যোগাসনের মাধ্যমে মনকে চাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  • নিজেকে সময় দেওয়া: কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক ব্যস্ততার মাঝেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা এবং নিজের ভালোলাগার শখগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমেও মানসিক চাপমুক্ত ও সুস্থ থাকা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.