মুজফফরনগরের কারখানায় হাড়হিম করা ‘দাসত্ব’: ২০ ঘণ্টা খাটুনি, আধার-মোবাইল কেড়ে লোহার রড ও পিটবুল দিয়ে নির্যাতন, উদ্ধার ১২

পরিবারের অভাব দূর করতে এবং দু’মুঠো ভাতের আশায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরের একটি কাগজের থালা-বাটি তৈরির কারখানা তাঁদের জীবনকে ঠেলে দিয়েছিল এক অবর্ণনীয় নরককুণ্ডে। সম্প্রতি মুজফফরনগর পুলিশের এক ঝটিকা অভিযানে ওই কারখানায় মাসের পর মাস বন্দি থাকা ১২ জন শ্রমিককে উদ্ধারের পর সামনে এসেছে এক ভয়ঙ্কর আধুনিক দাসত্বের চক্র। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডের মতো জনবহুল এলাকা থেকে ভালো চাকরি, থাকা-খাওয়া ও মোটা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই শ্রমিকদের নিয়ে আসা হতো। কিন্তু কারখানায় পা রাখার পরেই বদলে যেত সম্পূর্ণ ছবি।

পাঁচিল টপকে বিক্রমের পলায়ন, তাতেই পর্দাফাঁস

মুজফফরনগরের এসএসপি (SSP) সঞ্জয় বর্মা জানিয়েছেন, এই চক্রের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন রাজস্থানের যোধপুরের বাসিন্দা বিক্রম নামে এক শ্রমিক। গত ২২ জুন ওই কারখানার উঁচু পাঁচিল টপকে কোনোমতে পালাতে সক্ষম হন তিনি। পালিয়ে সোজা তিতাবী (Titawi) থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে কারখানার অমানবিক অত্যাচারের খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁর বয়ানের ভিত্তিতেই পুলিশ সোমবার কারখানায় হানা দিয়ে ১১ জন এবং পরবর্তীতে আরও ১ জন সহ মোট ১২ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে।

এই ঘটনায় কারখানার মালিক অঙ্কিত বালিয়ানের বাবা প্রদীপ এবং সুপারভাইজার শিব ত্যাগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মূল অভিযুক্ত অঙ্কিত পলাতক, তাঁর সন্ধান চলছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।

পরিচয়পত্র ও মোবাইল কেড়ে ২০ ঘণ্টার খাটুনি

তদন্তে জানা গেছে, কারখানায় ঢোকার পরপরই শ্রমিকদের মোবাইল ফোন, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সহ সমস্ত পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হতো। কারখানা চত্বরের বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। প্রতিদিন ভোর ৪টে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত— একটানা প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করানো হতো তাঁদের।

আগ্রার বাসিন্দা সোনু চৌহান নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন:

“আমাকে বলা হয়েছিল দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে এবং মাসে ১৪ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে। সঙ্গে থাকা-খাওয়া ফ্রি। কিন্তু কাজে যোগ দিতেই আমার মোবাইল ও পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হলো। দিনে ২০ ঘণ্টার বেশি খাটাত। একটু ভুল হলেই জুটত নির্মম মারধর, খাবারও দেওয়া হতো না।”

লোহার রড দিয়ে মার, পাহারায় হিংস্র পিটবুল

উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করার পর চিকিৎসকেরা শিউরে উঠেছেন। রিপোর্টে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন শারীরিক নির্যাতনের ফলে শ্রমিকদের কারও শরীরে গভীর কাটার দাগ, কারও হাড় ভাঙা, আবার কারও শরীরে রয়েছে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, সামান্য প্রতিবাদ করলেই বা ৩-৪ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে চাইলে লোহার রড, বেল্ট ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হতো। কেউ যাতে কাজ বন্ধ করতে না পারেন বা কারখানা থেকে পালানোর চেষ্টা না করেন, তার জন্য কারখানায় পাহারায় রাখা হয়েছিল হিংস্র ‘পিটবুল’ কুকুর। এই হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের দিনরাত কাজ করতে বাধ্য করা হতো।

তুষের রুটি আর সামান্য তরকারি, মৃত্যুর আশঙ্কা

২০ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি করালেও শ্রমিকদের কপালে জুটত মাত্র একবেলা সামান্য খাবার। তাও আবার তুষ দিয়ে তৈরি রুটি আর সামান্য তরকারি। কারখানায় বন্দিদশার কথা বলতে গিয়ে পুলিশের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক শ্রমিক। দীর্ঘ পাঁচ মাস নিখোঁজ থাকার পর উদ্ধার হওয়া উত্তরপ্রদেশের অমরোহার বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী দিলশাদ মহম্মদের বাবা মেহেরবান শাহ বলেন, “ছেলে বেঁচে আছে না মরে গেছে জানতাম না। সব ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ মঙ্গলবার ওর ফোন পেয়ে হাতে চাঁদ পেয়েছি।”

পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই তীব্র পুষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত খাটুনি, ঘুমের অভাব এবং অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের কারণে ইতিপূর্বে কারখানার ভেতরেই হয়তো কোনো কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রক্রিয়া জারি রেখেছে মুজফফরনগর পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.