বরিশালের বাকেরগঞ্জের কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটুবাবু) জমিদার বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত। তবে এই বাড়ি ও সম্পত্তি দখলের পায়তারা করছে স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের সহযোগীরা।

সম্প্রতি এ ঘটনায় স্থানীয় বাকেরগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন নাটুবাবুর ছোট ছেলে লন্ডন প্রবাসী বিপ্লব বহ্নি রায় চৌধুরী। জিডি নং ২৫২/১৯। একই সাথে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, জিডিতে স্থানীয় শান্তি কমিটির সহযোগী মৃত কাঞ্চন মাস্টারের ছেলে নিজামুল কাদির ও মো. রফিক হাওলাদারের বিরুদ্ধে সম্পত্তি দখলের পায়তারা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়াও শামিম হাওলাদার, শাহিন হাওলাদারসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই কাজে জড়িত আছে বলে অভিযোগ এই জমিদার পরিবারের।

সূত্র জানায়, বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর গ্রামে আনুমানিক ১৬ শতকের দিকে এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরী। ১৯ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত এই জমিদারির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তাদের পঞ্চম বংশধর কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটুবাবু)।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, আজন্ম বিপ্লবী জমিদার নাটুবাবু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় সৈনিক। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর তিনি শ্যামপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটিত করেন। এজন্য শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তাসহ সব ধরনের সহায়তা দেন তিনি। তাই আজও বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নাটুবাবুর জমিদার বাড়িটি অত্যন্ত প্রিয়।

তারা আরও জানান, দেশ স্বাধীনের মাত্র দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে স্থানীয় রাজাকার হাশেম আলী ও তার সহযোগীরা নাটুবাবুকে হত্যা করে। এরপর থেকে হারিয়ে যায় এই জমিদার বাড়িটির সোনালী ইতিহাস।

নাটবাবুর স্ত্রী ছায়া রায় চৌধুরী বলেন, ‘স্বামী হত্যার পর আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলাম। তিনি আমার স্বামী হত্যার বিচারের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। এমনকি আমাদের ৪ সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্বও নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তিনিও বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব-পরিবারকে হত্যা করা হয়। এরপর আবারো অন্ধকার নেমে আসে আমাদের পরিবারের ওপর।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধীরা। তারা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্নভাবে আমাদের ওপর হয়রানি করা হয়, যা এখনও চলছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে পরিবারটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ভরসার জায়গা, সেই পরিবারটিই এখন টিকে থাকতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধে বাকেরগঞ্জে ভুলু বাহিনীর নেতা ও বর্তমানে কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খান আলতাফ হোসেন ভুলু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও নাটুবাবুর বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করেন নাটুবাবু। ওই সময়ে নানা অত্যাচার সহ্য করলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশ থেকে সরে যাননি তিনি।’

এ সময় তিনি সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িটি সংরক্ষণ করার দাবি জানান।

বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী সালেহ মুস্তানজির বলেন, ‘ইতোমধ্যে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ওই পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত কোনো স্থাপনা ও সম্পত্তি যদি কেউ দখল করার পায়তারা করে তবে তা মেনে নেয়া হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষই উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য উপজেলা প্রশাসন সজাগ আছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.