প্রতিদিন সকালে বাঁশির শব্দে ঘুম ভাঙে অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শরৎনগরের বাসিন্দাদের। নীল ও সবুজ প্লাস্টিকের পাত্রে গৃহস্থালির জমানো আবর্জনা নিয়ে একে একে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন স্থানীয়রা। তিন চাকার ময়লা টানার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ৫১ বছর বয়সি প্রৌঢ়া রেখা চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘদিনের সাধারণ গৃহবধূ রেখা আজ এলাকার মানুষের পরম পরিচিত ও ভালোবাসার ‘রেখাদি’।
উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের বাসিন্দা রেখার স্বামী অজয় চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবর্জনা সংগ্রাহক। পরপর কয়েকটি স্ট্রোক ও দৃষ্টিশক্তি হারানোর ফলে অজয়বাবু কাজ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন। সংসারের হাল ধরতে এবং স্বামীর চাকরিটি যাতে হাতছাড়া না হয়, সেই তাগিদে সাইকেল চালাতে না জানা রেখা নিজেই রক্তজল করা পরিশ্রম করে শিখ নেন তিন চাকার ভ্যানরিকশা চালানো। পুরসভার তরফ থেকে তাঁকে সহজ কোনো কাজের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তিনি এই কঠিন কাজকেই বেছে নেন।
দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়া এবং শত পরিচর্যা সত্ত্বেও মাসকয়েক আগে স্বামীকে হারিয়েছেন রেখা। বর্তমানে একা থাকলেও পুরসভার স্বল্প বেতন এবং কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাই তাঁর বেঁচে থাকার সম্বল। এলাকার মানুষের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক—একদিন কাজে না গেলে প্রতিবেশীরাই ফোন করে খোঁজ নেন তাঁর স্বাস্থ্যের। আসন্ন দুর্গাপুজো উপলক্ষে পুরসভার থেকে বোনাস পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত তিনি।
অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় রেখার কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিক সম্পর্কের প্রশংসা করে জানান, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে এলাকা পরিষ্কার করার মাধ্যমে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজের এই কটাক্ষহীন ভালোবাসা ও স্বামীর কাজকে স্বগর্বে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আনন্দকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন ‘নির্মল বন্ধু’ রেখা চট্টোপাধ্যায়।

