লুম্বিনীর রম্যোদ্যানে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে শাক্যকুলে যে নবীন চন্দ্রের উদয় হইয়াছিল তাহাকে দেখিয়া ঋষি অসিত রাজা শুদ্ধোদনকে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া বলিয়াছিলেন যে, একদিন এই চন্দ্রের সমুজ্জ্বল কিরণে সমগ্র জগৎ আলোকিত হইবে। সমস্ত প্রাণীর মঙ্গলের জন্য ইহার আবির্ভাব। ইহার বিমল শিক্ষা সংশয়-উদ্‌ভ্রান্ত জগতের নিকট সমুদ্রে নষ্টপোত নাবিকের আশ্রয়দাত্রী তীরভূমির ন্যায় হইবে। ইহার ধ্যানের ক্ষমতা শান্ত জলাশয়ের ন্যায় হইবে এবং কামনারূপ অনাবৃষ্টিতে দগ্ধ প্রাণিগণ স্বেচ্ছায় তথা হইতে জলপান করিবে। লোভাগ্নির উপর ইহার করুণার মেঘ উদিত হইয়া ধর্মবৃষ্টিতে ঐ অগ্নি নির্বাপিত করিবে।


সত্যসঙ্কল্প ঋষির বাক্য সফল হইয়াছিল। নিদাঘতপ্ত, শোণিতলিপ্ত ভারতভূমিতে তথাগতের করুণাবারি অঝোরধারায় একদিন নামিয়া আসিয়াছিল। দিকে দিকে উড্ডীন হইয়াছিল ‘ধর্মসাম্রাজ্যের’ বিজয়পতাকা। অতল সমুদ্রের মতো গভীর বুদ্ধদেশনা হইতে প্রাণরস লইয়া এই উপমহাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এক কল্যাণময় রূপ ধারণ করিয়াছিল। কিন্তু এই মহতী রূপ একদিনে সৃষ্ট হয় নাই। যে-মহাবৃক্ষের বীজ ভারত-ভারতীর মানসলোকে তিনি বপন করিয়াছিলেন তাহা তাঁহার স্থূলশরীরের অন্তর্ধানের তিন শতাব্দীর মধ্যেই ফুলে-ফলে পল্লবিত হইয়া তাঁহার জন্মভূমিকে ছায়াদানে স্নিগ্ধ করিয়া বহির্ভারতের আকাশে আপন শাখা-প্রশাখাকে বিস্তারিত করিয়াছিল।


ইহা সত্য, ভগবান বুদ্ধ এক মহান ভিক্ষুসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কিন্তু ইহাই তাঁহার সমগ্র পরিচয় নহে—তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণপ্রদাতা। তাঁহার প্রচারিত মার্গ কিংবা নির্বাণতত্ত্ব নিঃশ্রেয়সকে নির্দেশ করিয়া অভ্যুদয়ের স্রোতে এই ভারতভূমিকে প্লাবিত করিয়াছিল। তিনি শ্রেষ্ঠ আচার্যগণের ন্যায় মানুষ গড়িতেই আসিয়াছিলেন। অষ্টাঙ্গমার্গের অনুশীলনে মানবের অন্তরে নিহিত সম্পদের উৎকর্ষ-বিধানই ছিল তাঁহার উদ্দেশ্য। জাতি-কর্ম-নির্বিশেষে সকলের জন্যই তিনি নির্বাণের দ্বার খুলিয়া দিয়াছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলিয়াছিলেন: ‘তথাগতের ঘোষিত ধর্ম কাহাকেও আশ্রয় করিতে কিংবা বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে কাহাকেও সংসারত্যাগী হইতে কহে না; তথাগতের ধর্ম প্রতিটি মনুষ্যকে অহঙ্কারের মোহ হইতে মুক্ত হইতে, স্বীয় অন্তঃকরণের বিশুদ্ধতা সম্পাদন করিতে, ভোগসুখের তা পরিহার করিতে এবং সাধুজীবন যাপন করিতে শিক্ষা দেয়।’


তিনি আরও বলিয়াছেন: “মানুষ যাহাই করুক সংসারে থাকিয়া শিল্পী, বণিক এবং রাজকর্মচারী হউক কিংবা সংসারত্যাগী হইয়া ধর্মচিন্তায় নিরত হউক, সর্বান্তঃকরণে তাহাকে স্বীয় কর্মে নিযুক্ত হইতে হইবে, তাহাকে পরিশ্রমী ও উদ্যমশীল হইতে হইবে।


তিনি নিশ্চেষ্টতা পছন্দ করিতেন না। কিন্তু তিনি ইহাও চাহিতেন যে, সেই চেষ্টা যেন সত্যকে আশ্রয় করিয়া বর্ধিত হয়। পাটলীপুত্রের নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি যে-উপদেশ দিয়াছিলেন তাহাতে কোন জাতি বা বর্ণের বিভাজন ছিল না। তাহাতে যে বিভাজন ছিল তাহা কেবল কর্মের চরিত্রের বিভাজন। সেই উপদেশে একদিকে ছিল গর্হিত আচরণে অভ্যস্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের অপকারকদের সৎপথে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান ও অপরদিকে ছিল সৎপথে পরিভ্রমণশীল অনিন্দিত কর্মীদিগের প্রতি গভীর আশ্বাস।
কর্ম ও তাহার বিবিধ পরিণামসকলকে তন্ন তন্ন করিয়া বিশ্লেষণপূর্বক আপন শিষ্যবর্গকে তিনি শিক্ষা দিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন, মন্দমার্গে গমনশীল অপকারকগণের পঞ্চবিধ ক্ষতি হইয়া থাকে। প্রথমত, কুটিল পথের পথিক স্বীয় আলস্যবশত দারিদ্রপ্রাপ্ত হয়; দ্বিতীয়ত, তাহার অখ্যাতি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়; তৃতীয়ত, সে যে-সমাজেই প্রবেশ করুক—তাহা ব্রাহ্মণদিগেরই হউক, কিংবা অভিজাতবর্গের বা শ্ৰমণদিগেরই হউক—তথায় সে সঙ্কুচিত ও হতবুদ্ধি হইয়া থাকে; চতুর্থত, মৃত্যুকালে সে উদ্বেগপূর্ণ হয়; এবং সর্বশেষে, মৃত্যুর পর দেহের ধ্বংসাবসানে তাহার মন দুঃখময় অবস্থায় থাকে এবং এরূপ দুশ্চিত্ত ব্যক্তির কর্ম যেখানেই অনুষ্ঠিত হইবে, সেখানেই সৃষ্টি হইবে বেদনা ও সন্তাপ।


বিপরীতপক্ষে, ঋজুপথাবলম্বী সৎকর্মীর লাভও পঞ্চপ্রকারের হইয়া থাকে। প্রথমত, তিনি স্বীয় অধ্যবসায় দ্বারা সম্পত্তি লাভ করেন; দ্বিতীয়ত, তাঁহার খ্যাতি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়; তৃতীয়ত, যে-সমাজেই তিনি প্রবেশ করুন—তাহা ব্রাহ্মণদিগেরই হউক কিংবা অভিজাতবর্গের বা শ্রমণদিগেরই হউক—তথায় তিনি আত্মপ্রত্যয় ও ধৃতি সহকারে প্রবেশ করেন; চতুর্থত, তিনি বিনা উদ্বেগে দেহত্যাগ করেন; সর্বশেষে, মৃত্যুর পর শরীরের ধ্বংসাবসানে তাঁহার চিত্ত সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হয়। তাঁহার কর্ম যেখানেই প্রসারিত হউক না কেন সেখানেই পরম মঙ্গল ও শান্তি বিরাজ করে। এইরূপে তিনি প্রতিটি নাগরিকের চরিত্রের ভিত্তি নির্মাণ করিতে সদাসচেষ্ট ছিলেন। তিনি জানিতেন, বৃক্ষকে পরিচর্যা করিবার যদি সত্যই ইচ্ছা থাকে তবে তাহার মূলে জল ও সার দিতে হয়। সভ্য ও সংস্কৃত হইবার দিকে তাঁহার দৃষ্টি ছিল, সভ্য ও সংস্কৃত দেখাইবার দিকে নহে।


ব্যক্তি গড়িয়া তোলে গোষ্ঠী, সমাজ। গোষ্ঠী বা সমাজ কিরূপ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হইলে তাহা সংহত হয় এবং শত্রুদের নিকট দুর্ভেদ্য হইয়া উঠে সে বিষয়ে বুদ্ধের ভাবনার ইঙ্গিত পাই বর্ষকারের সহিত তাঁহার কথোপকথনে। মগধের রাজা অজাতশত্রু রাজ্যের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসকারী বৃজিগণকে ধ্বংস করিবার ইচ্ছাপোষণ করিতেন এবং এই বিষয়ে বুদ্ধের মত কী তাহা জানিবার অভিপ্রায়ে মন্ত্রী বর্ষকারকে তাঁহার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। মন্ত্রী উপস্থিত হইলে, বুদ্ধ রাজার এই আগ্রাসনের বিষয়ে নিরুত্তর থাকিয়া কেবল বৃজিগণের উৎকৃষ্ট সমাজ-ব্যবস্থার প্রশংসা করিয়া প্রকারান্তরে কিরূপে কোন দেশ, সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের উত্থান হয়, কিরূপেই বা তাহা পতনের অভিমুখে ধাবিত হয় সেই শিক্ষাই রাজাকে দিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন: “যতদিন বৃজিগণ নিজেদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য না রাখিয়া তাহাদের পরম্পরা অনুসারে জনসাধারণের অবাধ সম্মিলনের অনুষ্ঠান করিবে, ততদিন তাহাদের পতন না হইয়া উত্থানই হইবে। যতদিন তাহাদের মিলনে ঐক্য আছে, যতদিন তাহারা বয়োবৃদ্ধের সম্মান করিবে, স্ত্রীজাতিকে সম্মান করিবে, যতদিন তাহারা ধর্মানুরক্ত হইয়া যথোপযুক্ত আচারসমূহ পালন করিবে, যতদিন তাহারা ভিক্ষুগণের রক্ষা, সমর্থন ও ভরণপোষণে রত থাকিবে ততদিন তাহাদের পতন না হইয়া উত্থানই হইবে। প্রয়োজন কেবল বিশ্বাসের, বিনয়ের, পাপ-পরিহারের, জ্ঞানান্বেষণের, উদ্যমের এবং চিন্তাশীলতার।


শুদ্ধমাত্র নাগরিক জীবনকে সমৃদ্ধ করাই নহে, দেশের কর্ণধারগণের প্রতিও বুদ্ধের এক বার্তা ছিল। যেমন পরিবারের অভিভাবক উপযুক্ত না হইলে পরিবারের দুর্দশার অন্ত থাকে না, তেমনই সুশাসকের অভাবে সমাজ-দেশ গুমরিয়া কাঁদে। এই কারণেই প্রাচীন ভারতে রাজাকে পিতার মর্যাদা দেওয়া হইয়াছিল। বুদ্ধদেবের শিক্ষায় পাই ইহারই প্রতিধ্বনি। বুদ্ধ যখন জেতবনে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন উপদেশাকাক্ষী হইয়া রাজা প্রসেনজিৎ তাঁহার চরণপ্রান্তে উপনীত হন। নিজের চিত্তের মলিনতা অনুভব করিয়া রাজা সেইসময় অত্যন্ত বিমর্ষ ছিলেন। রাজার অন্তরের সংবাদ বুদ্ধের নিকট অবিদিত ছিল না। তিনি জানিতেন, ক্ষমতাকে সুষ্ঠুভাবে পরিপাক করা অত সহজ নহে। উন্নত চরিত্রবল না থাকিলে ক্ষমতা অত্যন্ত অনভিপ্রেত মন্দ ফল প্রসব করে, যাহা প্রশাসক এবং দেশ উভয়কেই ক্লিষ্ট করিয়া থাকে। বুদ্ধদেব এই কারণে রাজাকে নিজ কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠার সহিত আপন অন্তর্জগতের সমৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টিপাত করিতে উদ্বুদ্ধ করিলেন। তিনি প্রসেনজিৎকে বলিলেন: “পিতা একমাত্র পুত্রকে যে-চক্ষে দেখিয়া থাকে, আপনি প্রজাবর্গকেই সেই চক্ষেই দেখিবেন। তাহাদিগকে উৎপীড়ন অথবা বিনাশ করিবেন না; দেহের প্রত্যেক অঙ্গকে সংযত রাখিবেন, ভ্রান্তমত পরিত্যাগ করিবেন, সরল মার্গে বিচরণ করিবেন; অপরকে পদদলিত করিয়া নিজের গৌরব বৃদ্ধি করিবেন না। ক্লিষ্টের স্বস্তিদায়ক ও মিত্র হইবেন। রাজ্যৈশ্বর্যের উপর অযথা মনোনিবেশ করিবেন না, তোষামোদকারীর মিষ্টবাক্যে কর্ণপাত করিবেন না।’
বুদ্ধ বলিয়া যাইতে লাগিলেন: ‘বৃক্ষে যখন আগুন লাগে তখন পক্ষিগণ সেইখানে থাকিতে পারে কি? তদ্রুপ রিপুগণের আতিশয্যে যখন মনুষ্যের অন্তরাত্মা সহস্রশিখায় জ্বলে সেখানে সত্য থাকিতে পারে না।’


বুদ্ধ যখন এই কথাগুলি বলিতেছেন তখন সম্মুখে কোন রাজাকে বা প্রশাসককে দেখিতে পাইতেছিলেন না। তিনি দেখিতে পাইতেছিলেন কেবল একজন মানুষকে, যাহার মানসিক পুষ্টির উপর নির্ভর করিতেছে দেশের ভাগ্য। সে কারণেই তিনি রাজাকে স্মরণ করাইয়া দিলেন :


‘এই সত্য কেবলমাত্র সন্ন্যাসীর জন্য নহে; ইহা ভিক্ষু ও গৃহী সমভাবে সকলের জন্য প্রয়োজন। সঙ্ঘভুক্ত ভিক্ষু এবং পরিজনবেষ্টিত গৃহীর মধ্যে কোন প্রভেদ নাই। ভিক্ষু হইয়াও নিরয়গামী হওয়া যেমন সম্ভব, গৃহস্থের পক্ষেও সেইরূপ ঋষিত্বপ্রাপ্তি সম্ভব। কামনার স্রোত সকলের পক্ষে সমান বিপজ্জনক। ইহার ঘূর্ণিতে পড়িলে আর নিস্তার নাই। হে রাজন! মনকে উন্নত করুন, দৃঢ়সঙ্কল্পের সহিত সত্যের অনুগামী হউন; রাজোচিত আচরণ পালন করুন, বাহ্যবস্তুতে সুখান্বেষণ করিবেন না, নিজের মনের মধ্যে করিবেন। এইরূপে যুগযুগান্তরে আপনার নাম ব্যাপ্ত হইবে ও আপনি তথাগতের অনুগ্রহ লাভ করিবেন।

সৌজন্যে উদ্বোধন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.