পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে প্রয়োজনে ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে বিচারক নিয়ে আসতে পারবে কলকাতা হাই কোর্ট।
কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের রিপোর্টের প্রেক্ষিতেই এই জরুরি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বিচারকরা কাজ শুরু করলেও বর্তমান জনবল দিয়ে লক্ষ লক্ষ নথিপত্র যাচাই করা প্রায় অসম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান নির্দেশিকাগুলি একনজরে:
- বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা: কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি চাইলে অতিরিক্ত সিভিল জজ (সিনিয়র ও জুনিয়র ডিভিশন) নিয়োগ করতে পারবেন। অন্তত ৩ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের এই কাজে লাগানো যাবে।
- আন্তঃরাজ্য সহযোগিতা: প্রয়োজন পড়লে ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সাহায্য নেওয়া যাবে। সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট দুই রাজ্যের প্রধান বিচারপতিদের নির্দেশ দিয়েছে, কলকাতা হাই কোর্টের আবেদন অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে দ্রুত বিচার করতে। ভিনরাজ্যের এই বিচারকদের যাতায়াত ও সাম্মানিক ব্যয় বহন করবে নির্বাচন কমিশন।
- নথি যাচাইয়ের সময়সীমা: গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে সমস্ত নথি ইলেকট্রনিক বা সশরীরে জমা পড়েছে, কেবল সেগুলিই বিবেচিত হবে। নথিপত্র যথাযথ কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ERO এবং AERO-দের।
- তালিকা প্রকাশ: আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ধার্য থাকলেও, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা ‘আনম্যাপড ক্যাটেগরি’র যাচাই প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকলে কমিশন ধারাবাহিকভাবে তালিকা প্রকাশ করতে পারবে। পরবর্তী সেই তালিকাগুলিকেও ২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকার অংশ হিসেবেই ধরা হবে।
ভাষাগত জটিলতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
শুনানি চলাকালীন রাজ্য সরকারের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ভিনরাজ্যের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি সওয়াল করেন, অন্য রাজ্যের বিচারকরা বাংলা বুঝতে না পারলে কাজে সমস্যা হতে পারে। তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই আশঙ্কা খারিজ করে দিয়ে বলেন, “ইতিহাস বলছে এক সময় এই রাজ্যগুলি একই প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল, ফলে স্থানীয় উপভাষা বা ভাষাগত ধরণ থেকে তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারবেন।”
বর্তমান পরিসংখ্যান ও চ্যালেঞ্জ
আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি এবং আনম্যাপড তালিকায় প্রায় ৮০ লক্ষ নাম রয়েছে। ২৫০ জন জেলা ও অতিরিক্ত জেলা বিচারক বর্তমানে প্রায় ৫০ লক্ষ দাবি যাচাইয়ের কাজ করছেন। এই বিপুল পরিমাণ কাজের চাপ সামলাতেই অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে শীর্ষ আদালত। উল্লেখ্য, কাজের চাপে আগামী ৯ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের সমস্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ছুটি বাতিল করেছে হাই কোর্ট।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে নিজেদের ‘জয়’ হিসেবেই দেখছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের দাবি, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত রুখে দিয়েছে আদালত। সমাজমাধ্যমে তারা জানিয়েছে, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, সার্টিফিকেট ও আধার কার্ডকে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

