টুটে হুয়ে সপনো কি
সুনে কৌন সিসকি।
হ্যাঁ, তাঁর স্বপ্ন বারবার চুরমার হয়েছিল।
অন্তর কো চির
ব্যথা পলকো পর ঠিঠকি।
কখনো পরাধীন ভারতবর্ষের জন্য ব্যথায়, কখনো দেশভাগের যন্ত্রণায় অন্তর থেকে দুঃখ পেয়েছিলেন। দেশের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে একটি পথ , একটি কর্মপদ্ধতিতে বিশ্বাস রেখেছিলেন ভারতরত্ন অটলবিহারী বাজপেয়ী। ১৫ বছর বয়সের একজন কিশোর হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ‘স্বয়ংসেবক’ হয়ে যাত্রা শুরু।গোয়ালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ (বর্তমানে মহারানী লক্ষ্মীবাঈ কলেজ) থেকে হিন্দী, ইংরেজি ও সংস্কৃতে স্নাতক। এরপর কানপুরের ডিএভি (DAV) কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর (MA) ডিগ্রী লাভ করেন। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে বড় ভাই প্রেম বিহারী বাজপেয়ীর সাথে ২৩ দিনের জন্য কারাবরণ করেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রেরণায় দেশের জন্য সারাজীবন কাজ করার ব্রত নিয়ে ১৯৪৭ সালে ‘প্রচারক’ হন অর্থাৎ গৃহীর জীবন ত্যাগ করে একজন ব্রহ্মচারী হিসেবে পূর্ণ সময় রাষ্ট্রের জন্য সমর্পণের প্রতিজ্ঞা করেন। ক্ষুরধার লেখনী, নিজের কবি-প্রতিভাকে রাষ্ট্রোত্থানের জন্য ব্যবহার করতে ভারত বিভাজনের পর RSS-এর মুখপত্র ‘রাষ্ট্রধর্ম’, ‘পাঞ্চজন্য’ এবং দৈনিক ‘স্বদেশ’ ও ‘বীর অর্জুন’-এর মতো সংবাদপত্রে সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেশের প্রয়োজনে একজন নিষ্ঠাবান স্বয়ংসেবক হিসেবে যখন যে ক্ষেত্রে কাজ করার প্রয়োজন হয়েছে সেই পথেই নিজের ‘অটল’ ধ্যেয়নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ (BJS) গঠিত হলে শ্রী গুরুজীর( রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক) ইচ্ছানুযায়ী তিনি BJS-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দেন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হন।১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে কাশ্মীরে প্রবেশ করার সময় গ্রেপ্তার হন। সেখানে মুখোপাধ্যায়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর জনসংঘের দায়িত্ব কাঁধে নেন ২৯ বছরের অটলবিহারী।১৯৫৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর আসন থেকে প্রথমবার লোকসভার সাংসদ নির্বাচিত হন।১৯৬৮সালে পন্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর ভারতীয় জনসংঘের জাতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও পন্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু যেন ভারতমাতার পরমবৈভবশালী হওয়ার পথে কালের ছলনা কিন্তু বাজপেয়ীর পণ —
হার নাহি মানুঙ্গা
রাঢ় নাহি ঠানুঙ্গা।
কাল কে কাপাল পার
লিখতা মিটাতা হু।
গীত ন্যায়া গাতা হু।
গীত ন্যায়া গাতা হু।।
কিন্তু দেশহিতের এই ‘গীত’-এর পথে বাধা হলো জরুরি অবস্থা। লক্ষ লক্ষ স্বয়ংসেবকদের মতো অটলবিহারী বাজপেয়ী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় অন্যান্য বিরোধী নেতাদের সাথে কারাবরণ করেন। জরুরি অবস্থা শেষে জনসংঘ অন্যান্য বিরোধী দলের সাথে মিশে ‘জনতা পার্টি’ গঠন করে। মোরারজি দেশাইয়ের সরকারে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ১৯৭৭ সালে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (UNGA) সম্পূর্ণ হিন্দীতে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে ‘স্ব’ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।১৯৮০ সালে জনতা পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর এল. কে. আদবানি ও ভৈরোসিং শেখাওয়াতদের সাথে মিলে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রথম সভাপতি হন। ১৯৯৬ সালের মে মাসে একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজেপি সরকার গঠন করে এবং বাজপেয়ী প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারায় মাত্র ১৩ দিন পর পদত্যাগ করেন। এইদিন অটলবিহারী বাজপেয়ীর ভাষণ ভারতবর্ষের সংসদীয় রাজনীতিতে বিখ্যাত হয়ে আছে যেখানে একজন রাজনীতিবিদের থেকেও বেশি করে অটলবিহারী বাজপেয়ীর একজন ‘স্বয়ংসেবক’ হিসেবে স্বাক্ষ্য প্রদান করে। তিনি বলেছিলেন ‘”সরকারেঁ আয়েঙ্গি, যায়েঙ্গি। পার্টিয়াঁ বনেঙ্গি, বিগড়েঙ্গি। লেকিন ইয়ে দেশ রহনা চাহিয়ে। ইস দেশ কা লোকতন্ত্র অমর রহনা চাহিয়ে।” আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ আর কেন্দ্রের সরকার এই মতাদর্শের সমর্থক।”হম সত্তা কে লোভ মে অপনে সিদ্ধান্তোঁ কা পরিত্যাগ নহী করেঙ্গে” — বাজপেয়ীজী নিজের কথা আর কাজের মধ্যে মিল করে দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (NDA) সরকার গঠন করে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদ ছিল মাত্র ১৩ মাস-এর।১৯৯৯ সালের এপ্রিলে এআইএডিএমকে (AIADM) সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে মাত্র ১ ভোটে তাঁর সরকার পড়ে যায়। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে কার্গিল বিজয়ের স্থপতি বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন NDA বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং বাজপেয়ী তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি প্রথম অ-কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন আর গণতন্ত্র থেকে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিকে মুক্ত করার পথে অগ্রসর হন। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে রাজস্থানের পোখরানে পাঁচটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা (Operation Shakti) চালিয়ে ভারতকে পূর্ণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে ঘোষণা করা , ‘স্বর্ণ চতুর্ভুজ’ (Golden Quadrilateral) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের চার মহাসড়ককে যুক্ত করা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা’ চালু করা, দেশের প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ শুরু করা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ‘পোটো’ (POTO/POTA) প্রণয়ন করে নিজের দূরদৃষ্টির পরিচয় রাখেন বাজপেয়ীজী। নিজের সারাজীবনের এই ক্লান্তিহীন সাধনার জন্য কী ছিল অটলজীর প্রেরণা? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রত্যেক স্বয়ংসেবকের প্রেরণার থেকে তা আলাদা নয় —-
ভারত কোই ভূমি কা টুকড়া নেহি,
ইয়ে জিতা জাগতা রাষ্ট্রপুরুষ হ্যায়।
ইয়ে বন্দন কি ধরতি হ্যায়,
ইয়ে অভিনন্দন কি ধরতি হ্যায়।
ইয়ে অর্পণ কি ভূমি হ্যায়,
ইয়ে তর্পণ কি ভূমি হ্যায়।
ইসকা নদী নদী হামারা লিয়ে গঙ্গা হ্যায়,
ইসকা কঙ্কর কঙ্কর হামারা লিয়ে শঙ্কর হ্যায়।
হাম জিয়েঙ্গে তো ইস ভারত কে লিয়ে,
ঔর মরেঙ্গে তো ইস ভারত কে লিয়ে।
ঔর মরনে কা বাদ ভি গঙ্গাজলমে বেহেতি হুয়ি হামারা অস্থিও মে কোই কান লাগাকে শুনেগা তো এক হি আওয়াজ আয়েগি ’ভারত মাতা কি জয়’।
পিন্টু সান্যাল
2026-08-16

