পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে চলমান জটিলতায় বড়সড় নির্দেশ দিল দেশের শীর্ষ আদালত। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজ্যের ‘স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট’ (এসআইআর) বা বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন কোনওভাবেই হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাবতীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ওপর।
বিচারবিভাগীয় কাজে ‘বাধা’ নয়: কঠোর হুঁশিয়ারি শীর্ষ আদালতের
বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এদিন সাফ জানায়, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের কাজে নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কাজে ব্যাঘাত ঘটে, এমন কোনও পদক্ষেপ কমিশন নিতে পারবে না। প্রয়োজনে কমিশনকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির অনুমতি নিতে হবে। এই নির্দেশ অমান্য করলে জরিমানার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আদালত।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে আদালত বিরক্তি প্রকাশ করে। রাজ্যের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, “বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা কাজ করছেন, তাঁদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না।”
ট্রাইবুনাল গঠনের নির্দেশ
ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই ট্রাইবুনালের বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- এর নেতৃত্বে থাকবেন একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং সঙ্গে থাকবেন হাইকোর্টের দুই-তিন জন বিচারপতি।
- ট্রাইবুনালের সদস্যদের মনোনীত করবেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি।
- বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক বা একজিকিউটিভ কর্তার কাছে নয়, আবেদন করতে হবে এই ট্রাইবুনালেই।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
শুনানি চলাকালীন ভোটারদের তথ্য নিষ্পত্তি নিয়ে রাজ্য ও আদালতের তথ্যে গরমিল ধরা পড়ে।
- রাজ্যের দাবি: মেনকা গুরুস্বামী জানান, এখনও প্রায় ৫৭ লক্ষ ভোটারের তথ্য নিষ্পত্তি হওয়া বাকি।
- আদালতের তথ্য: প্রধান বিচারপতি জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির রিপোর্ট অনুযায়ী ইতিমধ্যেই ১০ লক্ষ ১৬ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৫০০-র বেশি এবং ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে প্রায় ২০০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক এই তদারকির কাজ করছেন।
প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও লগইন আইডি সমস্যা
শুনানিতে উঠে আসে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কাজ করার ক্ষেত্রে ‘লগইন আইডি’ সংক্রান্ত সমস্যার কথা। আদালত জানায়, নির্বাচন কমিশনের ‘ভুলের কারণে’ এই প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে। কমিশনকে অবিলম্বে এই ত্রুটি সংশোধন করে আধিকারিকদের জন্য নতুন আইডি তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতিরা স্পষ্ট করেন, “কলকাতা হাইকোর্ট এবং বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা যাতে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তার জন্য কমিশন ও রাজ্য সরকারকে সবরকম বন্দোবস্ত করতে হবে।”
অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ
রাজ্যের অন্যতম আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দাবি জানান। আদালত জানায়, যেহেতু এখনও নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি, তাই এই মুহূর্তে কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না। তবে বৈধ ভোটারদের নাম যাতে কোনওভাবেই বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাঁর নির্দেশের ভিত্তিতেই কমিশনকে তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

