টানা কুড়ি বছরের রমরমা কারবার এখন পুরোপুরি স্তব্ধ। আজ থেকে প্রায় আট মাস আগে রাজ্যে বিশেষ নজরদারি তথা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অন্যতম লাভজনক অবৈধ ব্যবসা—‘ধুড় পারাপার’ বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্ত পার করানোর কাজ। রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের পর অদূর ভবিষ্যতেও এই বেআইনি কারবার চালু হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না সীমান্ত এলাকার দালালরা। ফলে বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের পথ খুঁজছেন তাঁরা।
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানা এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল (নাম পরিবর্তিত)। সীমান্ত থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়ি। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি উন্মোচন করলেন সীমান্ত পারাপারের এই অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
ভৌগোলিক অবস্থান ও ‘ঘাট’ নিয়ন্ত্রণ
বনগাঁ মহকুমার প্রান্ত থেকে শুরু করে সুন্দরবনের উত্তর-পশ্চিম কোণ পর্যন্ত সোনাই এবং ইছামতী নদীর মধ্যবর্তী সীমান্তজুড়ে রয়েছে আরশিকারি, পদ্মবিলা, হাকিমপুর, তারালি, আমুদিয়া, খলসি, দোবিলা, কৈজুড়ি, গাবর্ডা, পাইকরডাঙা, পানিতর, ঘোজাডাঙা, সোলাদানা, হরিহরপুর, দক্ষিণ বাগুন্ডি এবং টাকি-র মতো অসংখ্য জনপদ। সিরাজুলের তথ্য অনুযায়ী, এই বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অনুপ্রবেশের একাধিক সুবিধাজনক পয়েন্ট, যা স্থানীয় ভাষায় ‘ঘাট’ নামে পরিচিত। কোন ঘাটে কখন বিএসএফ (BSF)-এর নজরদারি কম থাকে, সেই খবর ও-পারের পাচারকারীরাই বেশি রাখত এবং সেই অনুযায়ী ‘ধুড়’ পার করা হতো।
যেভাবে চলত আন্তর্জাতিক চক্র
অনুপ্রবেশের এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হতো:
- সমন্বয় ও যোগাযোগ: বাংলাদেশ ও ভারতের ঘাটপার্টিদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকত। ও-পারের পাচারকারীদের কাছে ভারতীয় সিমকার্ড এবং এ-পারের দালালদের কাছে বাংলাদেশি সিমকার্ড থাকত, যাতে সীমান্ত অঞ্চলেও নেটওয়ার্কের সমস্যা না হয়। আর্থিক লেনদেন মূলত ফোনেই চূড়ান্ত হতো এবং অনেক সময় বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান করা হতো।
- লাইনম্যানের ভূমিকা: ভারতের সীমানার ভেতর ধান বা পাটক্ষেতের ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকত ‘লাইনম্যানেরা’। বিএসএফ-এর টহলদারি দলের গতিবিধির ওপর নজর রেখে তারা ও-পারে সিগন্যাল দিত। সবুজ সংকেত মিললেই ‘ঘাটপার্টি’ মুহূর্তের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্ত পার করে দিত। এই কাজ দিন-রাত সব সময়ই চলত।
- দালালদের দায়িত্ব: ও-পারের ঘাটপার্টি প্রতি অনুপ্রবেশকারীর জন্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫ হাজার টাকা নিত। সেখান থেকে ভারতীয় মুদ্রায় ৩ হাজার টাকা পাঠানো হতো এ-পারের দালালদের কাছে। এই টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পেত ভারতীয় ঘাটপার্টি, এবং বাকি টাকা থেকে ‘লাইনম্যান’ ও ‘লেবার’ (পথপ্রদর্শক) পেত ৫০০ টাকা করে। জিরো পয়েন্ট থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যাওয়া, নিকটবর্তী বাস বা রেলস্টেশনে পৌঁছানো এবং হাওড়া, শিয়ালদহ বা বিধাননগর স্টেশন পর্যন্ত পথপ্রদর্শক দিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব থাকত এ-পারের দালালদের ওপর।
কোটি কোটি টাকার লেনদেন ও বিজিবি-র ভূমিকা
সিরাজুলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র হাকিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী পাঁচটি ঘাট দিয়ে দৈনিক গড়ে ৩০-৩৫ জন বাংলাদেশি ভারতে প্রবেশ করত। সেই হিসাবে প্রতি ঘাটে মাসে গড়ে প্রায় হাজারখানেক মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটত, যার আর্থিক মূল্য ঘাটপ্রতি মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা। যদি কোনও অনুপ্রবেশকারী বিএসএফ-এর হাতে ধরা পড়ত, তবে লোকসান গুণতে হতো এ-পারের দালালদের। কারণ বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বিজিবি’ (BGB)-কে দেওয়া মাথাপিছু টাকা ফেরত পাওয়া যেত না। ফলে ও-পারের ঘাটপার্টিকে মাথাপিছু ২৫০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হতো এ-পারের দালালদের।
সিরাজুল দাবি করেন, অনুপ্রবেশের রমরমার সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তজুড়ে প্রায় এক হাজারটি সচল ‘ঘাট’ ছিল, যার মধ্যে বনগাঁর একাংশ এবং মালদহ ও মুর্শিদাবাদ সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ ঘটত। সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে এই অবৈধ ব্যবসায় মাসে ৭০-৮০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার হাতবদল হতো। এই কার্যকলাপে বিজিবি-র বড় ভূমিকা থাকত। তবে বিএসএফ-এর প্রসঙ্গে প্রাক্তন দালালদের দাবি, বছর দশেক আগে থেকেই বিএসএফ-এর এই চক্রে যোগসাজশ কমতে শুরু করে এবং গত পাঁচ বছরে বিএসএফ-এর সঙ্গে তাদের কোনও রফা বা চুক্তি ছিল না। বিএসএফ-কে ফাঁকি দিতে পারলে ব্যবসা হতো, ধরা পড়লে টাকা মার যেত। আর এখন কড়াকড়িতে তা সম্পূর্ণ বন্ধ।
ভুয়ো নথির অনুসারী ব্যবসা ও পঞ্চায়েত যোগসাজশ
সীমান্ত পার করানোর পরই দালালি ব্যবসার কাজ শেষ হতো না। অনুপ্রবেশকারীদের ভারতে পাকাপাকিভাবে বসবাসের জন্য আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও প্যান কার্ডের মতো বৈধ নথির প্রয়োজন হতো। আর এই সুযোগে সীমান্ত এলাকার কিছু অসাধু পঞ্চায়েত ও পুরপ্রধান টাকার বিনিময়ে জন্মের ভুয়ো শংসাপত্র ও ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বানিয়ে দেওয়ার সমান্তরাল ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন। এই কাজে মহকুমা (SDO) বা ব্লক (BDO) উন্নয়ন দপ্তরের কিছু কর্মীর একাংশের যোগসাজশও ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশকর্মী স্বরূপনগরের শাঁড়াপুল-নির্মাণ গ্রাম পঞ্চায়েতের এক প্রাক্তন তৃণমূল প্রধানের জালিয়াতির এক অদ্ভুত পদ্ধতির কথা জানান। প্রধানের পদ চলে যাওয়ার পরও তিনি নিজের কাছে রেখে দেওয়া লেটারহেডে ব্যাকডেটে (পুরনো তারিখে) শংসাপত্র দেওয়ার কাজ চালাতেন।
এমনই এক ঘটনায়, আমেরিকার ভিসা নবীকরণের সমস্যায় পড়া স্বরূপনগরের এক যুবকের জন্য ১৯৮৬ সালের একটি জাল বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি করেন ওই প্রাক্তন প্রধান। কাগজটিকে প্রাচীন ও আসল দেখানোর জন্য তিনি একটি অ্যালুমিনিয়ামের বাটির তলা দিয়ে সেটি ঘষে ঘষে কালো ছোপ তৈরি করেন। এরপর কাগজের কোণগুলো মুড়ে ও ধারগুলো সামান্য ছিঁড়ে ফেলে সেটিকে দুদিন চালের বস্তার ভেতর রেখে দেন, যাতে কাগজটি দেখতে হুবহু কয়েক দশকের পুরনো মনে হয়। এই জাল শংসাপত্রটি মার্কিন প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরিচিতদের ক্ষেত্রে নিখরচায় করলেও, অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকে এই ধরনের নিখুঁত জাল নথির বিনিময়ে মওকা বুঝে ৫০০ থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হতো।
তবে রাজ্যে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চালু হওয়া এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যাপক সক্রিয়তায় এই বিশাল আন্তর্জাতিক চক্রের চাকা আচমকাই পুরোপুরি থমকে গেছে।

