সিন্ধু সভ্যতার অনবদ্য সৃষ্টি এবং বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম সমাদৃত নিদর্শন ‘ডান্সিং গার্ল অফ মহেঞ্জোদারো’ বা মহেঞ্জোদারোর নৃত্যরতা কিশোরী মূর্তি। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পুরনো চার ইঞ্চির এই ছোট্ট ব্রোঞ্জমূর্তিটি নিয়ে একদা প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ মর্টিমার হুইলার লিখেছিলেন, “ওর মতো সুন্দর জিনিস দুটি দেখিনি… এক হাত কোমরে আর অন্য হাতটি ঝুলিয়ে রেখে সে দিব্যি দাঁড়িয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে!” যুগের পর যুগ ধরে ভারতের ইতিহাস বইয়ে এই মূর্তির ছবি অবিকৃতভাবেই দেখেছে শিক্ষার্থীরা। তবে এবার সেই বিশ্ববন্দিত শিল্প নিদর্শনেই ডিজিটাল ‘বসন’ পরানোর অভিযোগ উঠল, যা নিয়ে দেশের শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও শিল্পীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: নবম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ডিজিটাল ‘বসন’
ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (एनसीईआरटी / NCERT)-এর অধীনে নবম শ্রেণির সরকারি ইতিহাস বইয়ের ‘হিস্ট্রি অফ আর্টস’ (শিল্পকলার ইতিহাস) অধ্যায়ে ওই মূর্তির ছবিটিতে বদল আনা হয়েছে। নতুন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মূর্তির অনাবৃত শরীরের বুকের উপর থেকে উরু পর্যন্ত অংশ একটি কালো রঙের ডিজিটাল পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, মূর্তিটিকে কালো রঙের কোনো পোশাক পরানো হয়েছে।
সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না করা হলেও, এনসিইআরটি সূত্রে খবর— মূর্তির আদি রূপটিকে ‘নগ্নতার প্রকাশ’ মনে করার কারণেই এই অংশটি ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তীব্র প্রতিবাদ: “দেশের শিল্পের জন্য অন্ধকার দিন”
এনসিইআরটি-র এই ‘নগ্নতা’র যুক্তি মেনে নিতে পারছেন না দেশের প্রথম সারির ইতিহাসবিদ ও শিল্পকলা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ৪,৫০০ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্যকে আধুনিক চশমায় পরিমাপ করা আসলে ইতিহাসমনস্কতার অভাব।
- দীপালি ভট্টাচার্য (কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ):“আমরা তো ওই মূর্তিকে সবসময় ভাস্কর্য এবং শিল্প হিসেবেই দেখেছি, কখনও নগ্ন নারী মনে হয়নি। ওড়িশার কোণার্ক সূর্য মন্দির, খাজুরাহোর মন্দির কিংবা বাংলার অজস্র টেরাকোটার মন্দিরেও এমন অনাবৃত ভাস্কর্য রয়েছে। সেই সব শিল্পকে যদি শুধু নগ্নতার নিরিখে বিচার করা হয়, তবে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকেই অস্বীকার করা হয়। এমনটা হলে বলতে হবে, দেশের শিল্পীদের জন্য অন্ধকার দিন আসতে চলেছে।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, তবে কি এখন থেকে শিশুদের নিয়ে কোণার্ক বা অজন্তা-ইলোরা গুহায় যাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে?
- অন্বেষা সেনগুপ্ত (অধ্যাপিকা, ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা): তাঁর মতে, তফাতটা আসলে মানসিকতায় তৈরি হয়েছে। পূর্বতন এনডিএ সরকারের আমলে যখন মুরলী মনোহর যোশী শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, কিংবা পরবর্তী ইউপিএ সরকারের আমল— কোথাও এই ছবি ঢাকার প্রয়োজন পড়েনি। তিনি বলেন, “২০১৪ সালের পর থেকে যেভাবে ইতিহাস ক্রমাগত বদলানো হচ্ছে, তাতে এক বিশেষ আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের পড়ার ভার কমানোর নামে সুলতানি আমলের ইতিহাস কমানো হচ্ছে, আবার কোথাও হরপ্পা সভ্যতাকে হিন্দুদের সভ্যতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।” তাঁর দাবি, মূর্তির নগ্নতা ঢাকতে গিয়ে উল্টে জোর করে এর ওপর যৌনতা আরোপ করা হলো এবং শিক্ষার্থীরা এই শিল্প সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠবে।
- কণাদ সিংহ (অধ্যাপক, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃত কলেজ):“শিল্পকে যদি সত্যিই বুঝতে হয়, তবে শিল্পকর্মটি প্রকৃত যে রকম, ঠিক সে ভাবেই শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।”
ভিন্ন মত: শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ
শিক্ষাবিদদের একাংশ অবশ্য এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে অন্য মনস্তাত্ত্বিক কারণ দেখছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দেবজিৎ দত্ত মনে করছেন, নবম শ্রেণির একজন ছাত্র বা ছাত্রীর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ যে স্তরে থাকে, তার ওপর এই ভাস্কর্যের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বিবেচনা করেই হয়তো এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনিও স্পষ্ট জানান:
“ইতিহাসের তথ্য একজন গবেষক যেভাবে পান, সেই তথ্যকে ঠিক সেই আলোকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইতিহাসের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের মূল উপাদান বা তথ্যের সঙ্গে কোনও ধরনের কাটছাঁট বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।”
বিকৃতির বিরুদ্ধে সরব শিক্ষামহল
ঐতিহাসিক তথ্যের এই ‘ডিজিটাল রূপান্তর’ বা আড়াল করার প্রবণতা নিয়ে মোটের ওপর ক্ষুব্ধ শিক্ষামহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাস ও প্রাচীন শিল্পকে আধুনিক নৈতিকতার মাপকাঠিতে বিচার করতে গিয়ে প্রকারান্তরে ইতিহাসের উপাদানকেই বিকৃত করা হচ্ছে। এখন দেখার, এনসিইআরটি-র এই সিদ্ধান্ত এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই জাতীয় বিতর্ক আগামী দিনে কোন মোড় নেয়।

