ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর ওপরই চূড়ান্ত সিলমোহর দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং সাংবিধানিক এক্তিয়ারভুক্ত বলে বুধবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। আইনজীবীদের মতে, বিহারের একটি মামলাকে কেন্দ্র করে এই রায় দেওয়া হলেও, এর সাংবিধানিক বৈধতা সমগ্র দেশের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
“সুষ্ঠু গণতন্ত্রের ভিত্তি নির্ভুল ভোটার তালিকা”: সুপ্রিম কোর্ট
কমিশনের এসআইআর করার এক্তিয়ার ও নিয়মনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। গত জানুয়ারি মাসে এই মামলার শুনানি শেষ হলেও রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছিল। বুধবার মামলার নিষ্পত্তি ঘটিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, নির্বাচন কমিশন নিজের ইচ্ছামতো ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি।
রায় দিতে গিয়ে শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ পেশ করে:
“ভারতের গণতন্ত্র সঠিক ও নির্ভুল ভোটার তালিকার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদি ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নাম কিংবা অন্য জায়গায় চলে যাওয়া মানুষের নাম রয়ে যায়, তবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ভোটার তালিকাকে পরিষ্কার, নির্ভুল রাখা এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি যাতে তালিকায় ঢুকতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।”
আদালত আরও উল্লেখ করে, বিহারে সর্বশেষ ২০০৩ সালে এই নিবিড় সংশোধন হয়েছিল। দীর্ঘ ২২ বছর পর হওয়া এই সংশোধনকে কোনোভাবেই নাগরিকদের ‘গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর অপ্রয়োজনীয় আঘাত’ বা ‘অযৌক্তিক’ বলা যায় না। আদালত স্বীকার করেছে যে এই প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সাধারণ মানুষকে সাময়িক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে রায়ে বলা হয়েছে, কারও নাম আগের তালিকায় থাকা মানেই তিনি বৈধ ভোটার, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে আর কখনো তাঁর ভোটার যোগ্যতা যাচাই করা যাবে না। পুনরীক্ষণ না করা হলে ভুয়ো ভোটার চিহ্নিত করা অসম্ভব।
নাগরিকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছে কমিশন
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে রায়ে উল্লেখ করেছে আদালত। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, আইন মেনে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে প্রত্যেককে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নাম বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানানোর পাশাপাশি নাগরিকদের আপত্তি দাখিল করা এবং শুনানির (Hearing) সম্পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে কমিশন।
বিহারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাচাইকরণের জন্য ১১টি নির্দিষ্ট নথিকে মান্যতা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কোন নথি গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা কমিশনের আছে কি না। এর উত্তরে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধন যেহেতু কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব, তাই যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথির রূপরেখা নির্ধারণের ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। উপরন্তু, ২০০৩ সালের তুলনায় এবার আরও বেশি নথি গ্রহণ করা হয়েছে।
সীমিত পরিসরে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষমতা
নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে কি না, সেই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়েও এদিন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
শীর্ষ আদালত রায়ে জানায়, কমিশন অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ভোটারদের প্রাথমিক নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে। কোনো ব্যক্তি ভোটার হওয়ার যোগ্য কি না এবং তিনি ভারতীয় নাগরিক কি না— তা দেখার প্রাথমিক অধিকার কমিশনের রয়েছে। তবে কমিশনের এই ক্ষমতা কেবল ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং ভোট দেওয়ার অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে: নির্বাচন কমিশন যদি যাচাইকরণের পর কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদও দেয়, তার মানে এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ‘বিদেশি নাগরিক’ বলে গণ্য হবেন। কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার আইনি এক্তিয়ার ও দায়িত্ব কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে।
দেশজুড়ে ভোটার তালিকা ঝাড়াই-বাছাইয়ের উদ্দেশ্যে গত বছর বিহার থেকে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) শুরু করেছিল নির্বাচন কমিশন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি সাম্প্রতিক পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গেও এই এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ শুদ্ধিকরণ অভিযান আইনিভাবে আরও শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

