সংসদ চত্বরে দলীয় একতার বার্তা দেওয়ার পরও বিতর্ক এড়ানো গেল না এনসিপিআই (NCPI)-এ। মঙ্গলবার সকালে সংসদের গ্রন্থাগার ভবনে অনুষ্ঠিত হয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট এনডিএ-র ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠক। দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এনসিপিআই সাংসদেরা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিলেও অনুপস্থিত ছিলেন দলের তিন সাংসদ— বহরমপুরের ইউসুফ পাঠান, মুর্শিদাবাদের আবু তাহের এবং জঙ্গিপুরের খলিলুর রহমান। বৈঠক চলাকালীন এই তিন জন সংসদ চত্বরেই উপস্থিত ছিলেন, যা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বৈঠকে যোগ দেওয়ার ঠিক আগেই এনসিপিআই-এর ২০ জন সাংসদের দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “এনসিপিআই-তে সকলে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।” কিন্তু তাঁর এই মন্তব্যের পরপরই বৈঠকে ওই তিন সাংসদের অনুপস্থিতি নজর কাড়ে রাজনৈতিক মহলের।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিন ধরেই এই তিন সাংসদকে ঘিরে জল্পনা তীব্র হচ্ছে। রাজনৈতিক সূত্রে খবর, তাঁরা পুনরায় কালীঘাট তৃণমূলে ফিরে যেতে আগ্রহী। সম্প্রতি তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় संसद চত্বরে আবু তাহের ও খলিলুর রহমানকে পাশে বসিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আমরা তো চাই সবাই ফিরে আসুন।” পাশাপাশি, সোমবার কালীঘাট তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও দাবি করেন, “ওদিকে যাওয়া অন্তত ছ’জন সাংসদ এবং বেশ কয়েক জন বিধায়ক আমাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন।” এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবারের বৈঠকে তাঁদের অনুপস্থিতিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে এই সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন আবু তাহের। মঙ্গলবার সংসদ চত্বরে তিনি স্পষ্ট জানান, “আমরা তো বলেইছি এনডিএ বা বিজেপিতে থাকব না। এনডিএ-র বৈঠকেও আমরা তিন জন সাংসদ যাইনি।” একই সঙ্গে তিনি জানান, রাজ্যের ‘উন্নয়নের স্বার্থে’ দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে যে বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে, তাতে তাঁরা নিশ্চিতভাবেই যোগ দেবেন।
অন্য দিকে, এ দিনের এনডিএ বৈঠকে এনসিপিআই-এর শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর পর প্রথম এনডিএ বৈঠকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপস্থিত থাকায় দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লোকসভায় মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সে দিন তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে একই সারিতে বসেছিলেন। মঙ্গলবারের বৈঠকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সামনের সারিতে আসন গ্রহণ করেন। অন্য প্রান্তে প্রথম সারিতে ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং দ্বিতীয় সারিতে উপস্থিত ছিলেন সংসদ শতাব্দী রায়।
মঙ্গলবারই দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে এক বৈঠকে বসছেন সুদীপ, কাকলি-সহ এনসিপিআই-এর অন্যান্য সাংসদেরা। গত মঙ্গলবারই এই বৈঠকটি হওয়ার কথা থাকলেও রাজ্য সরকারের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কারণে মুখ্যমন্ত্রী দিল্লি আসতে পারেননি। সোমবার পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কীভাবে উন্নয়নের কাজ ত্বরান্বিত করা সম্ভব, সে বিষয়েই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক এবং অন্যদিকে এনডিএ বৈঠকে তিন সাংসদের দূরত্ব বজায় রাখা— সব মিলিয়ে এনসিপিআই-এর অন্দরে সমীকরণ নিয়ে নতুন জল্পনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এনসিপিআই নির্বাচন কমিশনের নিকট একটি স্বীকৃত দল হলেও, তৃণমূল ছেড়ে আসা কাকলি ঘোষ দস্তিদারসহ ২০ জন সাংসদ এখনও পর্যন্ত লোকসভার খাতায় পৃথক এনসিপিআই সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। সংসদীয় নথিতে তাঁরা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবেই নিবন্ধিত রয়েছেন।

