আরজি কর মৃত্যুকাণ্ড: মার্চের শুরুতেই হয়েছিল লিফ্‌টের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, যান্ত্রিক ত্রুটি না কি গাফিলতি? তদন্তে লালবাজার

আরজি কর মৃত্যুকাণ্ড: মার্চের শুরুতেই হয়েছিল লিফ্‌টের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, যান্ত্রিক ত্রুটি না কি গাফিলতি? তদন্তে লালবাজার

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে লিফ্‌টে আটকে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে যে, দুর্ঘটনাকবলিত ওই লিফ্‌টটির স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়েছিল চলতি মাসের শুরুতেই। রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থার অডিট রিপোর্টে কোনো বড়সড় ত্রুটি মেলেনি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে যান্ত্রিক গোলযোগ না কি মানবিক গাফিলতি— কোন কারণে প্রাণ গেল দমদমের বাসিন্দার, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে লালবাজারের হোমিসাইড শাখা।

রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতাল সূত্রে খবর, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি প্রতি ২৫-৩০ দিন অন্তর লিফ্‌টগুলি পরীক্ষা করে। মার্চের প্রথম দিকেও আরজি করের তিনটি লিফ্‌টে নিয়মিত অডিট করা হয়েছিল। সংস্থার দাবি, সেই সময় লিফ্‌টটি সম্পূর্ণ সক্রিয় ছিল। তবে দুর্ঘটনার দিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা বুঝতে পুলিশ এখন হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ এবং লিফ্‌টের বাইরের ‘মেশিন রুম’-এর ওপর নজর দিচ্ছে।

  • তদন্তের কেন্দ্রে ‘মেশিন রুম’: দুর্ঘটনার সময় মেশিন রুমে কেউ প্রবেশ করেছিলেন কি না বা সেখান থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
  • প্রশিক্ষণের অভাব? লিফ্‌ট পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট তিন পাতার নিয়মাবলি রয়েছে। লিফ্‌টম্যানরা সেই প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না এবং আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তাঁরা নিয়ম মেনে কাজ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।

সেই অভিশপ্ত ভোর: সিসিটিভি ফুটেজ ও সময়ের ব্যবধান

তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন:

  1. ভোর ৪:১৫ মিনিট: অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ট্রমা কেয়ার সেন্টারের সামনে শেষবার দেখা গিয়েছিল।
  2. ভোর ৫:১২ মিনিট: অরূপের নিথর দেহ উদ্ধার করে ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
  3. ভোর ৬:৩০ মিনিট: অভিযোগ উঠেছে, দুর্ঘটনার প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও মর্মান্তিক পরিণতি

নিহত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর তিন বছরের ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন। স্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী, শৌচাগারে যাওয়ার সময় তাঁরা সপরিবারে লিফ্‌টে আটকে পড়েন। হঠাৎ লিফ্‌টটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে নীচে নামতে শুরু করে এবং অন্ধকার বেসমেন্টে পৌঁছে যায়।

“অন্ধকার বেসমেন্টে লিফ্‌টের দরজা খুললেও বাইরের লোহার গ্রিল তালাবন্ধ ছিল। কোনোমতে স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বের করে দিলেও, অরূপ নিজে লিফ্‌ট ও দেওয়ালের খাঁজে আটকে পড়েন। সেই অবস্থাতেই লিফ্‌টটি চলতে শুরু করলে সিমেন্টের দেওয়ালে পিষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।”

আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেফতারি

এই ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করেছে। তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ মেলায় তিনজন লিফ্‌টম্যান এবং দুজন নিরাপত্তাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তের প্রয়োজনে পূর্ত দপ্তরের (PWD) আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলবে পুলিশ। এদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ দেখায় এবিভিপি (ABVP)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.