কড়া স্ক্রুটিনি বা ঝাড়াইবাছাইয়ের পর রাজ্যের ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি যোগ্য মহিলার হাতে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে নতুন রাজ্য সরকার। এর মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩০০০ টাকা করে পৌঁছে গিয়েছে। বুধবার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের এক সরকারি কর্মসূচি থেকে এই বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
পূর্বতন সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের তুলনায় এই নতুন প্রকল্পে ভাতার পরিমাণ দ্বিগুণ (১৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০০ টাকা) করা হয়েছে। অথচ বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র এক হাজার কোটি টাকা। কম বরাদ্দে কীভাবে ভাতা দ্বিগুণ করা সম্ভব হলো— বিরোধীদের তোলা সেই প্রশ্নেরই এদিন কড়া জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে দেন, ভুয়ো উপভোক্তা ছেঁটে ফেলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এটি সম্ভব হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন:
“দেখতে হয় যাতে নিয়মের বাইরে কেউ না চলে যায়। কারণ, এটা কোনও ব্যক্তি বা দলের টাকা নয়, এটা সরকারের টাকা। সরকারের টাকা উপযুক্ত প্রাপকেরাই পাবেন। এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাস করি।”
লক্ষ লক্ষ ভুয়ো আবেদন ও ‘পুরুষ-লক্ষ্মী’র হদিশ
মুখ্যমন্ত্রী জানান, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য মোট ১ কোটি ৬০ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে নিবিড় তদন্তের পর ২৬ লক্ষ আবেদনকারীর ফর্ম বাতিল করা হয়েছে, কারণ তাঁরা যোগ্যতার মাপকাঠি পূরণ করতে পারেননি।
কেন এই ঝাড়াইবাছাইয়ের প্রয়োজন ছিল, তার খতিয়ান দিতে গিয়ে পূর্বতন সরকারের আমলের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী:
- ২৭ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা: আগের সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডারে প্রায় ২ কোটি উপভোক্তা ছিলেন। নতুন সরকারের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তার মধ্যে ২৭ লক্ষ জন ভারতীয় নাগরিকই নন অথবা ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম নেই। এদের মধ্যে অনেকে মৃত, অনেকে এ রাজ্যে থাকেন না, আবার অনেকের ৩টি জায়গায় নাম থাকায় ৩টি আলাদা অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছিল।
- ১০ লক্ষ ‘পুরুষ’ উপভোক্তা: মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট এই প্রকল্পে প্রায় ১০ লক্ষ পুরুষ ভাতা পাচ্ছিলেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “লক্ষ্মীর ভান্ডারের নামের টাকা কি পুরুষের অ্যাকাউন্টে যাওয়া উচিত? তাই ঝাড়াইবাছাই প্রয়োজন ছিল।”
উপভোক্তাদের পরিসংখ্যান ও মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস
ঝাড়াইবাছাই পর্ব শেষে বর্তমানে ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মহিলা এই প্রকল্পের জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী:
| উপভোক্তার শ্রেণী | সংখ্যা |
| তফসিলি জাতি (SC) | ২৬ লক্ষ ৬৩ হাজার ৫৫৫ জন |
| আদিবাসী (ST) | প্রায় ৫ লক্ষ জন |
| পাহাড়ি অঞ্চলের নেপালি-গোর্খা | ১ লক্ষ ২২ হাজার ৬২৮ জন |
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, ঝাড়াইবাছাইয়ের পর ১ কোটি ৯ লক্ষ ৯২ হাজার ৩৭৮ জনের অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যেই টাকা পাঠানো হয়েছে। বাকি থাকা যোগ্য আবেদনকারীদের অ্যাকাউন্টেও দ্রুত টাকা ঢুকতে শুরু করবে। এছাড়া সম্প্রতি আয়োজিত জনকল্যাণ শিবিরে নাম লেখানো ৮ লক্ষ ১৫ হাজার জনও এই সুবিধা পাবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সিএএ (CAA) বা ট্রাইবুনালে আবেদনকারী বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত মানবিকতার খাতিরে এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হবে। তবে কোনো অবৈধ বিদেশি বা নিয়মের বাইরের কেউ এই টাকা পাবেন না।
১২ পাতার ফর্ম বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ সুবিধা
এই প্রকল্পের জন্য ১২ পাতার দীর্ঘ ফর্ম পূরণ করানো নিয়ে ওঠা সমালোচনারও জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আসলে মাত্র ৪টি পাতা পূরণ করতে হয়েছিল। এই সমস্ত তথ্য ইতিমধ্যেই সরকারি পোর্টালে আপলোড করা হয়ে গিয়েছে। এর ফলে এই উপভোক্তা মহিলারা ভবিষ্যতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের অন্যান্য প্রকল্পের সুবিধাও সরাসরি পেয়ে যাবেন, তার জন্য তাঁদের আর নতুন করে কোনো ফর্ম ফিলাপ করতে হবে না।
বিরোধীদের কটাক্ষের জবাবে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমরা এক জন (বৈধ) উপভোক্তাকেও বাদ দেব না। আমরা উপভোক্তা বলি না। আমরা বলি এটা আপনার অধিকার।”

