দীর্ঘদিন ধরে চলা জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত শুকোনোর আগেই পুনরায় অশান্তির আগুনে জ্বলে উঠল উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্য মণিপুর। দুই নিখোঁজ কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং তাঁদের লাঞ্ছিত মৃতদেহের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই মঙ্গলবার অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ইম্ফল উপত্যকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজ্য সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচটি জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা (Internet Shutdown) বন্ধ করে দিয়েছে এবং জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।
অশান্তির সূত্রপাত: দুই কিশোরের মৃত্যুতে ছাত্রবিক্ষোভ
এবারের উত্তেজনার মূলে রয়েছে নিখোঁজ দুই কিশোরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বেশ কয়েকদিন নিখোঁজ থাকার পর তাঁদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মঙ্গলবার সকাল থেকে রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। বিচার চেয়ে আন্দোলনকারীরা রাজভবন ও মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল করে এগোনোর চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
রণক্ষেত্র ইম্ফল: টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট
বিক্ষোভকারীদের আটকাতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ব্যারিকেড দিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের সেল, স্মোক বম্ব এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে। প্রতিবাদীদের দিক থেকেও পাল্টা ইটবৃষ্টি শুরু হয়। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী জখম হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে গোটা ইম্ফল উপত্যকা আধাসামরিক বাহিনী ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF)-এর কড়া বেষ্টনীতে ঢাকা।
প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও ইন্টারনেট শাটডাউন
গুজব ছড়ানো রুখতে এবং উস্কানিমূলক তথ্য প্রচার বন্ধ করতে রাজ্য সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ইম্ফল পূর্ব, ইম্ফল পশ্চিম, থৌবাল, বিষ্ণুপুর এবং ককচিং জেলায় মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শান্তি বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক ও সিবিআই তদন্তের ইঙ্গিত
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিং। স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজিপি এবং অসম রাইফেলসের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর মুখ্যমন্ত্রী জানান:
- কড়া নজরদারি: পরিস্থিতির ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে এবং আইন ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- তদন্তের ভার: হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে ইতিমধ্যেই সিবিআই (CBI) তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
- শাস্তি: অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও মণিপুরের এই নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া অশান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নিয়মিত রাজ্য প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখছে।
জনজীবনে বিপর্যয়
বারবার ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউর ফলে মণিপুরের জনজীবন বিপর্যস্ত।
- অর্থনীতি: ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা অচল হওয়ায় চূড়ান্ত ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
- শিক্ষা: স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইন পড়াশোনাও থমকে গেছে।
- মানবিক সংকট: সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কায় বহু মানুষ পুনরায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছেন। ত্রাণ শিবিরগুলোতে খাদ্য ও ওষুধের সরবারহ নিশ্চিত করা এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ বা ইন্টারনেট বন্ধ করে এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ প্রশমন করা সম্ভব নয়। মণিপুরের সাধারণ মানুষ এখন স্থায়ী শান্তি এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

