আনুগত্যের ‘পুরস্কার’ পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর, এবার দলের সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বারাসতের এই সাংসদ তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে বারাসত জেলা সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাঁর জোরালো আবেদন, দল পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনও ‘ভুঁইফোঁড় সংস্থার’ বদলে যেন বিগত দিনের নিষ্ঠাবান পুরনো কর্মীদের ওপরই ভরসা রাখা হয়।
ক্ষোভের সূত্রপাত ও সংসদীয় পদ হারানো
সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর, গত ১৪ মে কালীঘাটে দলীয় সাংসদদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় যে, লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক (Chief Whip) পদের দায়িত্ব দেওয়া হবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ইতিপূর্বে এই পদে দায়িত্বরত ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার ঠিক পরের দিনই সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন বারাসতের সাংসদ। তিনি লিখেছিলেন:
“৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।”
রাজ্য সভাপতিকে চিঠি ও ইস্তফা
কালীঘাটের বৈঠকের পর থেকে শুরু হওয়া বিতর্কের মাঝেই, সমাজমাধ্যমের সেই পোস্টের ঠিক ৯ দিনের মাথায় জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সুব্রত বক্সীকে পাঠানো চিঠিতে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, “নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমার আবেদন, আপনি বিগত দিনের মতো নিষ্ঠাবান পুরনো কর্মীদের নিয়ে কাজ করলে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে মনে হয়। ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় বলে মনে হয় না।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে তৃণমূল যে পেশাদার সংস্থা ‘আইপ্যাক’-এর (I-PAC) সহায়তা নিয়েছিল, কাকলির এই ‘ভুঁইফোঁড় সংস্থা’ শব্দবন্ধটি সরাসরি তাদের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। ভোট-পরবর্তী সময়ে দলের একাংশ যখন এই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন একজন প্রবীণ সাংসদের এমন অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দুর্নীতি ও নৈতিক দায় নিয়ে স্পষ্ট বার্তা
দলীয় সংগঠনের ত্রুটি ও রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও চিঠিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন কাকলি। তিনি লিখেছেন:
“পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ ও দুর্নীতির কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা, শিষ্টাচার এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব, মূল্যবোধকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”
এর পাশাপাশি তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর সংসদীয় এলাকার অধীনে দল আশানুরূপ ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার নৈতিক দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েই তিনি বারাসত জেলা সভাপতির পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই আকস্মিক পদত্যাগ এবং দলের অভ্যন্তরীণ রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

