রান্নার গ্যাসের (LPG) জোগান নিয়ে দেশজুড়ে চলা অস্থিরতার মাঝে শুক্রবার সরাসরি ময়দানে নামল রাজ্য প্রশাসনের এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (EB)। বৃহস্পতিবার নবান্ন এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিশেষ ‘আদর্শ কার্যপদ্ধতি’ (SOP) জারি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতা ও জেলাগুলিতে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা ও ডিলারদের গুদামে হানা দেন আধিকারিকেরা। একদিকে জোগান ও মজুত নিয়ে সরকারি তৎপরতা, অন্যদিকে বুকিং করেও গ্যাস না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের হাহাকার— সব মিলিয়ে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে রাজ্যে।
ইবি-র ম্যারাথন তল্লাশি ও ডিলারদের ভূমিকা
শুক্রবার সকাল থেকেই কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে সক্রিয় হয় এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। লর্ডস মোড় থেকে শুরু করে মধ্যমগ্রামের বাদু বা হুগলীর চুঁচুড়া— সর্বত্রই তল্লাশি চালানো হয়।
- তদন্তের গতিপ্রকৃতি: আধিকারিকেরা ডিলারদের স্টক রেজিস্টার খতিয়ে দেখেন এবং সিলিন্ডারের প্রকৃত মজুত পরীক্ষা করেন।
- গরমিল ও অভিযোগ: উত্তর ২৪ পরগনার বাদুতে একটি গুদামে প্রচুর সিলিন্ডার মজুত থাকলেও কেন সাধারণ মানুষ গ্যাস পাচ্ছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হুগলিতে মহকুমাশাসক অয়ন নাথ নিজে ডিস্ট্রিবিউটারদের সাবধান করে দিয়ে জানিয়েছেন, কোনো কালোবাজারি বরদাস্ত করা হবে না।
- ডিলারদের দাবি: ডিলারদের একাংশের দাবি, আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের আগেই বুকিং করছেন বলেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বুকিং করেও মেসেজ না আসা বা ডেলিভারিতে দেরির অভিযোগ মানতে চাননি গ্রাহকেরা।
বিপাকে শিক্ষা, মৎস্য ও মন্দিরের ভোগ
এলপিজি সংকটের আঁচ সবথেকে বেশি পড়েছে গণবণ্টন ব্যবস্থা ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর।
- মিড-ডে মিল ও মা ক্যান্টিন: অনেক সরকারি স্কুলে গ্যাসের বদলে কাঠের জ্বালানিতে রান্না শুরু হয়েছে। বাঁশবেড়িয়া ও বসিরহাটের মতো এলাকায় গ্যাসের অভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে ‘মা ক্যান্টিন’।
- মৎস্যজীবী ও মৎস্য শিল্প: রান্নার গ্যাস না থাকায় সমুদ্রযাত্রা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী। মৎস্যজীবী নেতা সতীনাথ পাত্রের আশঙ্কা, বিকল্প জ্বালানির খোঁজে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে কাঠ কাটলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে।
- মন্দিরের ভোগ: শ্রীরামপুরের রাধাবল্লভ থেকে কোচবিহারের মদনমোহন মন্দির— ভোগের মেনুতে কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
- আইআইটি খড়্গপুর: ১৫ হাজার আবাসিক পড়ুয়ার খাবার জোটাতে এখন কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করছে আইআইটি কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলাশাসকের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের পরিস্থিতি: কৌশলী বদল
কলকাতার বড় হাসপাতালগুলিতে (এসএসকেএম, এনআরএস, আরজি কর) এখনও রান্নার গ্যাসের বড় সংকট তৈরি না হলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিকল্প ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। মেনু থেকে মাংস বা মাছের মতো পদ কমিয়ে সবজি ও ডিমের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে গ্যাস সাশ্রয় করা যায়।
সংসদে তৃণমূলের তীব্র প্রতিবাদ
গ্যাস সংকট নিয়ে শুক্রবার সংসদ চত্বরে সরব হন তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা সাংসদরা। মহুয়া মৈত্র, দোলা সেন, মিতালী বাগরা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের অভিযোগ, আড়াই দিনে গ্যাস পাওয়ার যে দাবি কেন্দ্র করছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মহুয়া মৈত্র সরাসরি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, “সরকার বলছে আড়াই দিনে সিলিন্ডার মিলবে, কিন্তু মানুষ ১০ দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও তা পাচ্ছেন না।”
বেআইনি কারবার: অটোয় রান্নার গ্যাস
জয়নগরে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস থেকে বেআইনিভাবে অটোতে গ্যাস ভরার অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশ্যেই এই কারবার চললেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। গ্যাসের অভাবকে পুঁজি করে একদল অসাধু চক্র সচল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।
মোদী সরকারের পাল্টা বার্তা
নয়াদিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, “গুজবে কান দেবেন না। আমাদের ২৫ হাজার পরিবেশকের কাছে পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত বুকিং করবেন না।”

