গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে। এই সংঘাতের আঁচ কেবল আরবের মরুভূমিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশ্বায়িত অর্থনীতির কারণে ভারত এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ ভারতের জনজীবন, অর্থনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা প্রধান ৫টি পয়েন্টে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো খনিজ তেল। ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে, যার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
- হরমুজ প্রণালীর সংকট: বিশ্বের মোট তেলের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয় এই পথ দিয়ে। যুদ্ধের জেরে এই রুট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
- আকাশছোঁয়া দাম: অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে। এর ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২. শেয়ার বাজারে ধস ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
যুদ্ধের খবরে ভারতের দালাল স্ট্রিটে বড় ধরনের কম্পন অনুভূত হয়েছে। সেনসেক্স এবং নিফটি রেকর্ড পতনের মুখে দাঁড়িয়ে।
- লক্ষ কোটি টাকার লোকসান: মাত্র কয়েক দিনে বিনিয়োগকারীদের বিপুল সম্পদ বাজার থেকে উধাও হয়েছে।
- টাকার অবমূল্যায়ন: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FIIs) ভারতীয় বাজার থেকে পুঁজি সরিয়ে সোনা বা ডলারে বিনিয়োগ করায় ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার (INR) মান রেকর্ড নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
৩. প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্স সংকট
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১ কোটি ভারতীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন।
- জীবনহানি: বাহরাইন ও আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতিমধ্যে ভারতীয়সহ দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
- উদ্ধারকাজ: সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে দেশে ফিরিয়ে আনা (Evacuation) সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স কমে গেলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারেও টান পড়বে।
৪. কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা (Diplomatic Tightrope)
ভারতের জন্য এই যুদ্ধ এক কঠিন পরীক্ষা। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইসরায়েল ও আমেরিকা—সবার সাথেই ভারতের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।
- চাবাহার বন্দর: মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রবেশের প্রধান পথ ইরানের চাবাহার বন্দর। ইরানের অস্থিতিশীলতা ভারতের এই কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
- প্রতিরক্ষা অংশীদার: প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েল ভারতের প্রধান সহযোগী। কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করা ভারতের জন্য প্রায় অসম্ভব। তাই ভারতকে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে।
৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস বিপর্যয়
লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে ভারতের পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইউরোপ ও আমেরিকায় যাতায়াত করে।
- পরিবহন খরচ: যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন দীর্ঘ পথ (আফ্রিকা ঘুরে) পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
- রপ্তানি হ্রাস: ভারতের চা, চাল, মশলা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ
২০২৬ সালের এই যুদ্ধ ভারতের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সাথে জড়িয়ে যাওয়া এক কঠোর বাস্তবতা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা প্রদান এখন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ভারত বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে যাতে দ্রুত এই সংঘাতের অবসান ঘটে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা: বর্তমান অস্থিরতার সময় বিচলিত হয়ে তড়িঘড়ি শেয়ার বিক্রি না করে ধৈর্য ধরা প্রয়োজন। তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক খবরের ওপর কড়া নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছে বিশেষজ্ঞরা।

