সাগরদ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। কাকদ্বীপ এবং সাগরদ্বীপের মাঝে মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণের জটিলতা অবশেষে দূর হলো। বিগত সরকারের গাফিলতিতে যে কাজ থমকে ছিল, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় জাহাজ ও জাতীয় জলপথ মন্ত্রকের থেকে তার প্রয়োজনীয় অনুমোদন আদায় করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এই সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পরিকাঠামো ক্ষেত্রে রাজ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি বৃহৎ রূপরেখা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করেছে দেশের অন্যতম অগ্রণী নির্মাণকারী সংস্থা ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্রো’ (L&T)।
পূর্বতন সরকারের অনুমোদনহীন শিলান্যাস ও রাজনৈতিক কৌশল
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিগত ৫ জানুয়ারি কাকদ্বীপ ও সাগরের মাঝে মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর এই সেতুর শিলান্যাস করেছিলেন তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্মাণ কাজের জন্য এল অ্যান্ড টি সংস্থাকে বরাত দেওয়া হলেও আসল আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করা হয়নি। যেহেতু মুড়িগঙ্গা নদীটি জাতীয় জলপথের অংশ, তাই এর ওপর যেকোনো ধরণের সেতু নির্মাণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সাগর দ্বীপের পশ্চিম দিক দিয়ে অসংখ্য জাহাজ ও ভেসেল বঙ্গোপসাগরে যাতায়াত করে এবং পূর্ব দিক দিয়ে ভেসেল যায় বাংলাদেশে। এই পূর্ব দিকেই সেতুটি গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু কেন্দ্রের থেকে অনুমতি নেওয়ার কোনো উদ্যোগই তৎকালীন তৃণমূল সরকার নেয়নি। সেই সময় বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, সেতু তৈরির কোনো সদিচ্ছা সরকারের নেই, এটি কেবলই “ভোটে উতরে যাওয়ার কৌশল”। তবে সেই কৌশল কাজে আসেনি; নির্বাচনে কাকদ্বীপ বা সাগর— কোনো আসনই ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল।
শুভেন্দুর তৎপরতায় কাটল জট, যুক্ত হবে রেলপথও
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে কেন্দ্রীয় জাহাজ ও জাতীয় জলপথ মন্ত্রকের সাথে সমন্বয় সাধন করে সমস্ত জট কেটে ফেলেছেন। কাকদ্বীপের লট নম্বর আট এবং সাগরের কচুবেড়িয়ার মাঝে প্রস্তাবিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৫ কিলোমিটার। আনুমানিক ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুটি নির্মাণ করতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
কেন্দ্রীয় জাহাজ, বন্দর ও জাতীয় জলপথ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এই বিষয়ে বলেন:
“রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমাদের প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। তার ভিত্তিতেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, মুড়িগঙ্গার ওপর সেতু তৈরির কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। শুধু সড়ক যোগাযোগই নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে কাকদ্বীপের সঙ্গে রেলপথের দ্বারাও জুড়ে যাবে সাগরদ্বীপ।”
বিমানবন্দর লাউঞ্জে এল অ্যান্ড টি কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
কেন্দ্রের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর, লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর শীর্ষ আধিকারিকদের সাথে বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সম্প্রতি কলকাতা বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে সংস্থার চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর (CMD) এস এন সুব্রহ্মণ্যমসহ তিন শীর্ষকর্তার সঙ্গে তাঁর আধ ঘণ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন হয়। বৈঠকটি নবান্নে হওয়ার কথা থাকলেও, মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা দিল্লি সফরের কারণে তারকেশ্বরের প্রশাসনিক কাজ সেরে তিনি সরাসরি বিমানবন্দরে চলে যান এবং সেখানেই এল অ্যান্ড টি কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সারেন।
নবান্ন সূত্রে খবর, এই বৈঠকে মুড়িগঙ্গা সেতুর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকা লগ্নির একটি মেগা পরিকাঠামো প্রস্তাব পেশ করেছে এল অ্যান্ড টি।
| প্রকল্পের ক্ষেত্র | প্রস্তাবিত পরিকাঠামোগত উন্নয়ন |
|---|---|
| তথ্যপ্রযুক্তি (IT) | নিউটাউনে আইটি পার্কের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকাঠামো নির্মাণ। |
| যানজট নিয়ন্ত্রণ | কলকাতা, শহরতলি ও জেলা শহরগুলিতে রাস্তা সম্প্রসারণ এবং নতুন উড়ালপুল তৈরি। |
| বাণিজ্যিক পরিবহণ | বাণিজ্যিক গতি বাড়াতে শহরের বাইরের অংশ বরাবর নতুন ‘রিং রোড’ নির্মাণ। |
| যোগাযোগ ব্যবস্থার মসৃণতা | কলকাতার নিকটবর্তী শিল্পোপযোগী জমির সাথে জাতীয় সড়কের সংযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। |
শিল্পমহলে ইতিবাচক বার্তা
বিগত বাম ও তৃণমূল সরকারের আমলে জমি অধিগ্রহণ নীতি এ রাজ্যে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে নতুন সরকার আসার পর এই অচলাবস্থা কাটবে বলে আশা করছে শিল্প মহল।
অতীতে এল অ্যান্ড টি রাজ্যে বিক্ষিপ্ত কিছু কাজ করলেও, রাজ্যের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এত বড় রূপরেখা ও বিনিয়োগের প্রস্তাব এর আগে কোনো শিল্প সংস্থা দেয়নি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এল অ্যান্ড টি-র এই ২০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর শিল্প ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

