দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তন সূচিত হলো। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। সোমবার ২৯৩টি আসনের যে ফলাফল সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের সাজানো দুর্গ ধসিয়ে দিয়ে গেরুয়া শিবির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন দখল করেছে।
এক নজরে নির্বাচনী ফলাফল ও পরিসংখ্যান
রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট বাতিল হওয়ায় সোমবার মোট ২৯৩টি আসনের গণনা সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান দলীয় বিন্যাস নিচে দেওয়া হলো:
| রাজনৈতিক দল | প্রাপ্ত আসন সংখ্যা | ভোটের শতাংশ (%) |
| বিজেপি (BJP) | ২০৭ | ৪৫.৮৪ |
| তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) | ৮০ | ৪০.৮০ |
| সিপিএম (CPIM) | ০১ | ৪.৪৫ |
| কংগ্রেস (INC) | ০২ | ২.৯৭ |
| এজেউপি (AJUP) | ০২ | – |
| আইএসএফ (ISF) | ০১ | – |
| অন্যান্য | – | ৪.২৬ |
| নোটা (NOTA) | – | ০.৭৯ |
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২১৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল, যেখানে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৭৭টি আসন। এবারের ফল সেই সমীকরণকে সম্পূর্ণ উল্টে দিল।
ভোটদানের হারে সর্বকালীন রেকর্ড ও ভোটার সংখ্যার রহস্য
এবারের নির্বাচন ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) পরবর্তী প্রথম ভোট। ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে:
- ভোটদানের হার: দুই দফা মিলিয়ে রাজ্যে গড়ে ৯২.৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা কেবল পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসেই নয়, সারা দেশের নিরিখে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৮২.১৭ শতাংশ।
- ভোটার সংখ্যা: এসআইআর প্রক্রিয়ার পর রাজ্যে ভোটার সংখ্যা ৫১ লক্ষ কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৮২ কোটিতে (২০২১ সালে যা ছিল ৭.৩৪ কোটি)।
- ভোটের পরিমাণ: মোট ভোটারের সংখ্যা কমলেও ভোটদানের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২১ সালে ৬.০৩ কোটি মানুষ ভোট দিলেও এবার দিয়েছেন ৬.৩৩ কোটি মানুষ। প্রতিটি বিধানসভায় গড়ে প্রায় ১০ হাজার ভোট বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিযায়ী ভোটার দূরদূরান্ত থেকে এসে ভোট দিয়েছেন, যা এই উচ্চ ভোটদানের হারের অন্যতম কারণ।
ফলতায় পুনর্নির্বাচন ও ডায়মন্ড হারবার প্রসঙ্গ
নির্বাচনী অপরাধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার গুরুতর অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের সম্পূর্ণ ভোটগ্রহণ বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে আগামী ২১ মে পুনরায় ভোটগ্রহণ হবে এবং ফল ঘোষণা হবে ২৪ মে। এছাড়া ডায়মন্ড হারবার এবং মগরাহাট পশ্চিমের ১৫টি বিতর্কিত বুথে গত ২ মে পুনর্নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্লেষণ: পদ্ম ঝড়ে বিপর্যস্ত ঘাসফুল
ভোটের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এবং ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ—এই দুইয়ের জোড়া ধাক্কায় তৃণমূলের ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ ধসে গিয়েছে। বিজেপির ৪৫.৮৪ শতাংশ ভোট প্রাপ্তি রাজ্যে এক নতুন মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাম-কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক আরও সংকুচিত হয়ে কার্যত প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

