সিয়াচেনের বরফ থেকে মহাসাগরের গভীরতা: ভারতীয় তিন বাহিনীর রণপ্রস্তুতির নয়া হাতিয়ার ‘যোগব্যায়াম’

সিয়াচেনের বরফ থেকে মহাসাগরের গভীরতা: ভারতীয় তিন বাহিনীর রণপ্রস্তুতির নয়া হাতিয়ার ‘যোগব্যায়াম’

সিয়াচেন হিমবাহের হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা, যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমে যায়। সেখানে একজন জওয়ানের দিন শুরু হয় ভারী অস্ত্রশস্ত্রের মহড়া দিয়ে নয়, বরং শান্ত হয়ে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে। আবার এই স্থান থেকে হাজার হাজার মিটার নিচে, ভারত মহাসাগরের অতল গভীরে সাবমেরিনের লোহার তৈরি সরু ঘরের ভেতর, টর্পেডো টিউবের মাঝেই মাদুর পেতে প্রাণায়াম করেন নৌসেনারা।

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সমুদ্রের বিশাল ও নির্জন জলরাশি—বর্তমানে ভারতের সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীতে যোগব্যায়াম দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এটি কেবল শরীর ভালো রাখার সাধারণ কোনো উপায় নয়, বরং দেশের সুরক্ষায় নিয়োজিত সৈনিকদের কাজের প্রস্তুতি, মানসিক জোর এবং শারীরিক শক্তি ধরে রাখার এক অন্যতম হাতিয়ার।

পৃথিবীর ছাদে প্রহরীদের মানসিক শক্তি জোগাচ্ছে প্রাণায়াম

সিয়াচেন, লাদাখ বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো অত্যন্ত উঁচুতে ডিউটি করা জওয়ানদের জন্য ভীষণ কঠিন। সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতির পাশাপাশি চারদিকে বরফ আর ভয়ংকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। মাসের পর মাস পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে একা লাগা, অনিদ্রা এবং মানসিক চাপ লেগেই থাকে।

এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সশস্ত্র বাহিনী প্রতিদিনের কাজের তালিকায় যোগব্যায়াম ও প্রাণায়াম যুক্ত করেছে:

  • শারীরিক অভিযোজন: অনুলোম-বিলোম বা কপালভাতির মতো শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কম অক্সিজেনের আবহাওয়াতেও শরীরকে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
  • মানসিক স্থিতিশীলতা: ধ্যান ও মন শান্ত রাখার ব্যায়াম জওয়ানদের মনকে সতেজ রাখে, যা একা থাকার কষ্ট বা দুশ্চিন্তা সামলাতে সাহায্য করে।
  • পেশির নমনীয়তা: যোগাসনের নানা ভঙ্গিমা শরীরের নমনীয়তা বাড়ায়। ফলে জওয়ানদের শরীরে ব্যথা-বেদনা কমে এবং ভারী জিনিস বয়ে পাহাড়ে ওঠার সময় পেশিতে টান লাগার ঝুঁকি হ্রাস পায়।

সাবমেরিনের কৃত্রিম পরিবেশেও শান্তির ছোঁয়া

নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিনে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে নাবিকদের সবসময় ছোট ও ঘুপচি জায়গায় থাকতে হয়। মাসের পর মাস বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, ইঞ্জিনের একটানা শব্দ এবং ডিউটির সময়ের হেরফেরের কারণে নাবিকদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই সমস্যা কাটাতে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনগুলোকে কার্যত ভাসমান শরীরচর্চা কেন্দ্রে বদলে ফেলেছে:

  • ক্লান্তি দূরীকরণ: সাবমেরিনের ভেতর জায়গার ভীষণ টানাটানি থাকা সত্ত্বেও ক্রু সদস্যরা দাঁড়িয়ে বা বসে ছোটখাটো কিছু যোগাসন করে নেন। এতে শক্ত হয়ে যাওয়া হাত-পায়ে আরাম মেলে এবং শারীরিক ক্লান্তি দূর হয়।
  • সজাগ দৃষ্টি: নির্দিষ্ট কিছু যোগব্যায়াম নাবিকদের ঘুমের চক্র ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে ডিউটিতে থাকাকালীন তাঁদের মন সজাগ থাকে।
  • দলগত সংহতি: যুদ্ধজাহাজের খোলা ডেকে যখন সব নাবিক একসঙ্গে গোল হয়ে যোগাসন করেন, তখন তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং প্রতিকূল সাগরেও কাজের স্পৃহা বাড়ে।

তিন বাহিনীর বারো মাসের রুটিন

সেনা, নৌ কিংবা বিমান বাহিনী—কোথাও যোগব্যায়াম এখন আর শুধু ২১ জুনের ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’-এর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে নেই। বরং বছরের পর বছর ধরে, সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ট্রেনার ও চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এই অভ্যাসটি কঠোর নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে।

মন ও শরীরের এই সুন্দর যোগসূত্র গড়ে ওঠার কারণে জওয়ানদের নানা রকম রোগবালাই, কাজের চাপজনিত সমস্যা এবং ক্লান্তি অনেকটাই কমে গেছে। আধুনিক যুগের যুদ্ধ মানেই চোখের পলকে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানসিক দিক থেকে পাহাড়ের মতো শক্ত থাকা। আর এই লক্ষ্যেই ভারতের সশস্ত্র বাহিনী তাদের জওয়ানদের ভেতর থেকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে প্রাচীন ভারতীয় যোগব্যায়ামের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.