বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রতিভাবান ও আলোচিত তরুণ তারকা স্পেনের লামিনে ইয়ামাল। সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া এই স্ট্রাইকার চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের অন্যতম প্রধান ভরসা। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের মহারণে তিনি যখন মাঠে নামবেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর পাশাপাশি টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখবেন বিশেষ দুজন মানুষও। এই দুজনেই মূলত বার্সেলোনার এই তরুণ ফুটবলারের খ্যাতনামী হয়ে ওঠার নেপথ্যের আসল কারিগর, যাদের নামের অনুপ্রেরণায় এই তারকার নামকরণ হয়েছে।
বিশেষ এই দুই ব্যক্তির অবদান ছাড়া হয়তো ইয়ামালের ফুটবলার হওয়াই হতো না, এবং বিশ্বের আর পাঁচটা দরিদ্র শিশুর মতোই তার স্বপ্নও অধরা থেকে যেত। অথচ তারা আজও প্রচারের আলোর আড়ালেই রয়ে গেছেন।
নামের উৎস ও এক মানবিক রূপকথা
স্পেনের রীতি অনুযায়ী এই ফুটবলারের পুরো নাম— লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। নামের শেষ দুটি অংশ ‘নাসরাউই’ এবং ‘এবানা’ এসেছে যথাক্রমে তার বাবা ও মায়ের বংশপরিচয় থেকে। এছাড়া আরবি শব্দ ‘আল আমিন’ (যার অর্থ সৎ বা বিশ্বস্ত) থেকে এসেছে ‘লামিনে’ এবং ‘জামাল’ (যার অর্থ সুন্দর বা সৌন্দর্য) শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘ইয়ামাল’। তবে এই দুই নামের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে চরম দারিদ্রের দিনগুলিতে পাশে থাকা দুই বন্ধুর এক আবেগঘন মানবিক গল্প।
ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই আদতে মরক্কোর বাসিন্দা এবং মা শিলা এবানা গিনির নাগরিক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে শিলা যখন ইয়ামালের জন্ম দেন, তখন এই অভিবাসী দম্পতি চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। নিজেদের দৈনন্দিন খরচ চালানোই যেখানে দায় ছিল, সেখানে সন্তানের জন্ম তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সেই কঠিন সময়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান তাদেরই দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর্থিক ও মানসিকভাবে তারা এই তরুণ দম্পতিকে ছায়ার মতো আগলে রাখতেন। সেই দুই বন্ধুর একজনের নাম ছিল ‘লামিনে’ এবং অন্যজনের নাম ‘ইয়ামাল’। বিপদের দিনে এই দুই বন্ধুর নিঃস্বার্থ সমর্থন, ভালোবাসা ও ঋণের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই দম্পতি তাদের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন ‘লামিনে ইয়ামাল’।
মেসি টু লা মাসিয়া: এক রূপকথার উত্থান
এরপর থেকে ইয়ামালের জীবন যেন কোনো রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে কিংবদন্তি লিওনেল মেসির কোলে ওঠার সুযোগ হয়েছিল তার। পরবর্তীতে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার ফুটবল প্রতিভার কারণে বার্সেলোনার বিখ্যাত অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে স্থান পান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পেশাদার ফুটবলের মূল পথচলা।
বিশ্বের অন্যতম আলোচিত তরুণ ফুটবল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ইয়ামাল কিন্তু তার কঠিন শৈশব ও শেকড়কে ভুলে যাননি। তার হাতের একটি আঙুলে আজও খোদাই করা রয়েছে ’৩০৪’ সংখ্যাটি। যে উদ্বাস্তু কলোনিতে তার শৈশব কেটেছিল, এটি মূলত সেই এলাকার পিন কোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। নিজের অতীত ও লড়াইয়ের প্রতি সম্মান জানাতেই এই সংখ্যাটি তিনি শরীরে ধারণ করে রেখেছেন।

