২০১১ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ বিগত তৃণমূল সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকড় খুঁজতে এক নজিরবিহীন ও বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল বর্তমান রাজ্য সরকার। সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুকে এই নবগঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বা প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
শক্তিশালী পরিকাঠামো ও কমিশনের কাঠামো
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তদন্ত প্রক্রিয়া যাতে কোনো বাধা ছাড়া মসৃণভাবে চলে, তার জন্য এই কমিশনকে অত্যন্ত পেশাদার ও শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
- তদন্ত শাখা: কমিশনের তদন্ত শাখার প্রধান বা কমান্ডিং দায়িত্বে থাকবেন এক জন প্রবীণ আইপিএস (IPS) আধিকারিক।
- প্রশাসনিক বিভাগ: প্রশাসনিক কাজকর্ম ও সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব সামলাবেন এক জন প্রবীণ আইএএস (IAS) বা ডব্লিউবিসিএস (WBCS) আধিকারিক, যিনি এই কমিশনের সদস্য-সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
- আর্থিক ও প্রযুক্তি শাখা: প্রযুক্তিগত অনিয়ম এবং আর্থিক তছরুপের দিকগুলি খতিয়ে দেখার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রেভিনিউ সার্ভিসের (WRS) এক জন দক্ষ আধিকারিককে এই কমিটিতে রাখা হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তদন্তের স্বার্থে রাজ্য সরকারের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে কমিশন বাইরে থেকেও অতিরিক্ত সদস্য বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করতে পারবে।
তদন্তের আওতায় শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এই তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যাপক ও দূরপ্রসারী হতে চলেছে। শিক্ষা, খাদ্য ও সরবরাহ, দুর্যোগ মোকাবিলা, পুর ও নগরোন্নয়ন, পঞ্চায়েত, আবাসন, মৎস্য, শিল্প, পূর্ত, ভূমি ও ভূমি রাজস্ব এবং জিটিএ (GTA)-সহ রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের বিগত ১৫ বছরের যাবতীয় দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এই কমিশন। তদন্তের মূল কাঠামোর মধ্যে রয়েছে— ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক নিয়ম ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া লঙ্ঘন, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ।
বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়োগ দুর্নীতি ও অন্যান্য অনিয়ম এবং সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্নীতিও এই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি, বেআইনি নির্মাণ ও পুর আইনের লঙ্ঘনের বিষয়গুলিও কমিশন খতিয়ে দেখবে। শুধু তদন্তই নয়, দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ হওয়া সরকারি অর্থ ও সম্পত্তি কীভাবে আইনানুগভাবে উদ্ধার করা যায়, সে বিষয়েও সরকারকে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে এই কমিশন।
সিভিল কোর্টের ক্ষমতা ও তদন্তের সীমাবদ্ধতা
কাজ পরিচালনার সুবিধার্থে এই কমিশনকে আইনগতভাবে সিভিল কোর্টের সমপর্যায়ের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কমিশন যেকোনো ব্যক্তিকে সমন পাঠিয়ে তলব করতে ও সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারবে। যেকোনো সরকারি রেকর্ড বা গোপন নথি তলব করার পাশাপাশি শপথের ভিত্তিতে জবানবন্দি নেওয়ার এক্তিয়ার থাকবে বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই কমিটির। এমনকি যেকোনো স্থানে বসে শুনানি করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে কমিশনকে। তদন্তে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষকে সরাসরি এফআইআর (FIR) দায়ের করার সুপারিশ করতে পারবে এই কমিটি।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে একটি স্পষ্ট সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যে সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যেই সিবিআই (CBI) বা অন্য কোনো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন, কিংবা অন্য কোনও জুডিশিয়াল কমিশনের বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলির ওপর এই কমিশন কোনও সমান্তরাল তদন্ত চালাতে পারবে না। কমিশনকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর তদন্তের অগ্রগতি এবং সুপারিশ-সহ বিস্তারিত রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থান
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এর আগে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের অত্যন্ত কড়া অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি দৃঢ় ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং প্রয়োজনে তা নিলামে তোলা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই চরম হুঁশিয়ারির পরই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে এই শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠনকে রাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।

