বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) পরিশোধ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করা নিয়ে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হলো। আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে বকেয়া টাকা মেটানো সম্ভব নয় জানিয়ে শুক্রবার শীর্ষ আদালতে আবেদন জমা দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি। প্রতিবাদে আগামী ১৩ মার্চ রাজ্যজুড়ে সরকারি দফতর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
রাজ্যের যুক্তি: প্রযুক্তিগত ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বকেয়া মেটানোর জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রার নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়। আদালতের নির্দেশ ছিল, ৬ মার্চের মধ্যে বকেয়ার পরিমাণ ও কিস্তি নির্ধারণ করতে হবে এবং ৩১ মার্চের মধ্যে প্রথম কিস্তির টাকা দিতে হবে।
তবে রাজ্য সরকার তাদের আবেদনে জানিয়েছে, এই বিশাল পরিমাণ অর্থ মেটানো এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানত তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
- নথিপত্র ডিজিটাইজেশন: ৩ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি কর্মরত কর্মচারী এবং বিপুল সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর তথ্য যাচাই করতে হচ্ছে। ২০১৬ সালের আগের অধিকাংশ নথি ‘সার্ভিস বুক’ আকারে হাতে লেখা রয়েছে, যা ডিজিটাল করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।
- নতুন পোর্টাল: তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি নতুন অনলাইন পোর্টাল তৈরি করা হচ্ছে, যার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এখনও বাকি।
- আর্থিক চাপ: বকেয়ার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। রাজ্যের বর্তমান ঋণ গ্রহণের সীমা (FRBM Act) এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের খরচের কথা মাথায় রেখে এই মুহূর্তে বিশাল অঙ্কের টাকা দেওয়া কঠিন বলে দাবি করেছে অর্থ দফতর।
রাজ্য আবেদন জানিয়েছে, অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া এবং প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে যেন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। পাশাপাশি, এই রায়ের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার একটি রিভিউ পিটিশন দাখিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
উত্তপ্ত কর্মচারী মহল: ১৩ মার্চ ধর্মঘটের ডাক
রাজ্য সরকারের এই আবেদনে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সরকারি কর্মচারীরা। কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী বলেন, “আমরা লড়াই করে অধিকার ছিনিয়ে এনেছি। রাজ্য সরকার টালবাহানা করলে ১৩ মার্চ কর্মচারীরা তাঁদের শক্তি বুঝিয়ে দেবেন।”
অন্যদিকে, সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ ওই দিন ‘বন্ধ মোবারক’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। শিক্ষক সংগঠনগুলির অভিযোগ, রাজ্যের আবেদনে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল একে “নিকৃষ্টতম নোংরামি” বলে অভিহিত করে ধর্মঘট সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক সমীকরণ
সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই ধর্মঘটের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন। কিন্তু ডিএ ইস্যু এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে সরকার কঠোর পথে হাঁটবে নাকি মধ্যস্থতার পথ খুঁজবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। সুপ্রিম কোর্ট সময়সীমা বাড়ানোর আর্জি মঞ্জুর করে কিনা, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যের লক্ষাধিক কর্মচারী ও পেনশনাররা।

