তিন মহাসাগর জুড়ে চিনের গোপন নজরদারি: সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরিতে সক্রিয় লালফৌজ

তিন মহাসাগর জুড়ে চিনের গোপন নজরদারি: সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরিতে সক্রিয় লালফৌজ

ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর এবং আর্কটিক (উত্তরমেরু) মহাসাগর— এই তিন বিশাল জলরাশি জুড়ে নিঃশব্দে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরির কাজ চালাচ্ছে চিন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেজিংয়ের এই গোপন সামরিক তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মূলত গুপ্তচর জাহাজ ও অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজের সাহায্যে এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে শি জিনপিং প্রশাসন।

রয়টার্সের অনুসন্ধান ও জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য

নিউজিল্যান্ডের ‘স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স’-এর জাহাজ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রয়টার্স গত পাঁচ বছরে চিনের ৪২টি জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে:

  • সমুদ্রের পরিবেশগত ও ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম তথ্য সংগ্রহ করছে চিন।
  • নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে ডুবোজাহাজ যুদ্ধ পরিচালনা এবং শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বেজিংকে কৌশলগত সুবিধা দেবে।
  • সমুদ্রতলে থাকা খনিজ সম্পদের অবস্থান চিহ্নিত করাও এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

কৌশলগত এলাকায় চিনা জাহাজের আনাগোনা

অনুসন্ধানে বিশেষভাবে চিনা গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং–৩’-এর নাম উঠে এসেছে। এই জাহাজটির সাম্প্রতিক কিছু গতিবিধি উদ্বেগ বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে:

  • ২০২৪-২৫: তাইওয়ানের পার্শ্ববর্তী সমুদ্র এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের কাছাকাছি এলাকায় একাধিকবার যাতায়াত করেছে জাহাজটি।
  • ভারত মহাসাগর: ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘ইউয়ান ওয়াং-৫’ এবং ‘ডং ফাং হং–৩’-কে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকায় দেখা গিয়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা বন্দরে এই জাহাজগুলি জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহ করেছে, যা নিয়ে ভারত সরকার কলম্বোর কাছে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল।

অত্যাধুনিক সেন্সর ও সেনাসজ্জা

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাপানের নিকটবর্তী সমুদ্রতলে চিন অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু সেন্সর ও নতুন যন্ত্র বসিয়েছে। এই সেন্সরগুলি জলের নিচের যেকোনো বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম। গত বছরের মে মাসেও যখন তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকা ও জাপানের সঙ্গে চিনের টানাপড়েন তুঙ্গে ছিল, তখনও ‘ডং ফাং হং–৩’ ওই এলাকায় অভিযান চালিয়েছিল।

চিনের দাবি বনাম বাস্তবতা

যদিও ‘ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়না’ দাবি করেছে যে, এই জাহাজগুলি মূলত সমুদ্রের জলবায়ু ও পরিবেশগত গবেষণার কাজ করছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়েরই গবেষকদের একাংশের নিবন্ধ অন্য কথা বলছে। রয়টার্স সেই নিবন্ধের সূত্র ধরে জানিয়েছে, এই গভীর সমুদ্র সমীক্ষার আসল লক্ষ্য হলো শত্রু ডুবোজাহাজের সম্ভাব্য আস্তানা চিহ্নিত করা এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

তিন মহাসাগর জুড়ে চিনের এই ধারাবাহিক নজরদারি উপকূলবর্তী দেশগুলির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.